রং-গন্ধে অনন্য, স্বাদে অতুলনীয় দেশজুড়ে খ্যাতি ফুলবাড়ীয়ার হলুদ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে রাঙ্গামাটিয়া, কালাদহ, এনায়েতপুর, কুশমাইল ও রাধাকানাই-বাকতা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ লালচে মাটির জনপদ আজ সোনালি সম্ভাবনার প্রতীক।
বিজ্ঞাপন
এই লাল মাটিতেই জন্ম নেয় এমন এক হলুদ, যার রং উজ্জ্বল, গন্ধ তীব্র আর স্বাদে রয়েছে আলাদা স্বাতন্ত্র্য। ফলে ফুলবাড়ীয়ার হলুদ এখন দেশজুড়ে সমাদৃত—এবং এই ফসল ঘিরেই বদলে যাচ্ছে শত শত কৃষকের জীবনচিত্র।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৯৫০ হেক্টর জমিতে হলুদের আবাদ হয়েছিল। পরের বছর তা কমে ৮৫০ হেক্টরে নেমে আসে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাজারদরের ধসের কারণে আবাদ আরও কমে দাঁড়ায় ৬৫০ হেক্টরে। তবে চলতি মৌসুমে বাজারে কিছুটা স্থিতি ফেরায় কৃষকদের আগ্রহ আবার বেড়েছে। এ বছর প্রায় ৭৫০ থেকে ৮০০ হেক্টর জমিতে হলুদের চাষ হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতি বছর উপজেলায় গড়ে সাড়ে তিন হাজার টন শুকনো হলুদ উৎপাদিত হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকার বেশি। ডিমলা, মালা ও মুথা—এই তিনটি দেশীয় জাত এখানে বেশি আবাদ হয়।
প্রবীণ কৃষক গোলাম মোস্তফা জানান, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছেন তাদের পরিবারে হলুদের চাষ হচ্ছে। তার ধারণা, রাঙ্গামাটিয়া অঞ্চল থেকেই প্রথম দেশি হলুদের আবাদ শুরু হয়। বর্তমানে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পার্শ্ববর্তী টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর ও ঘাটাইল এলাকাতেও।
চৈত্র-বৈশাখ মাসে মোটা বা ছড়া বীজ রোপণ করা হয়। প্রায় ৯-১০ মাস পর গাছের পাতা শুকিয়ে এলে শুরু হয় উত্তোলন। উত্তোলনের ১০-১৫ দিন আগে পাতা কেটে দেওয়া হয়। প্রতি কাঠা জমিতে জাতভেদে ১২ থেকে ১৫ মণ কাঁচা হলুদ পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
কাঁচা হলুদ তোলার পর শুরু হয় সেদ্ধ ও শুকানোর প্রক্রিয়া। বড় পাতিলে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সেদ্ধ করে বাঁশের ছাকনায় পানি ঝরিয়ে রোদে শুকানো হয়। ক্ষেত থেকে আনার দুই-তিন দিনের মধ্যে সেদ্ধ না করলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
সন্তোষপুর ও কালনা এলাকায় মৌসুমে চোখে পড়ে কর্মব্যস্ততা—কেউ হলুদ সরবরাহ করছেন, কেউ চুলায় জ্বালানি দিচ্ছেন, কেউ বা সেদ্ধ হলুদ শুকাতে দিচ্ছেন। খড়-বিচালি ও শুকনো পাতা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শ্রমিক গোলাপ মিয়া জানান, তারা দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরি পান। নারী শ্রমিক হোসনে আরা বলেন, তাদের পারিশ্রমিক ৩৫০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে মোটা শুকনো হলুদ প্রতি মণ ৬,৫০০ থেকে ৬,৭০০ টাকা এবং চিকন ছড়া হলুদ ৫,৫০০ থেকে ৬,০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। রাঙ্গামাটিয়ার ব্যবসায়ী ও চাষি মোজাফফর আলী বলেন, কেশবগঞ্জ বাজারে প্রতি হাটে প্রায় অর্ধকোটি টাকার হলুদ কেনাবেচা হয়। তবে সার, শ্রম ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় আগের তুলনায় লাভের পরিমাণ কমেছে।
তার মতে, ভারতীয় হলুদ আমদানি নিয়ন্ত্রিত হলে স্থানীয় উৎপাদকরা আরও ভালো দাম পেতে পারেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নুর মোহাম্মদ জানান, ফুলবাড়ীয়ার পাহাড়ি নিচু লাল মাটি হলুদ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এখানকার হলুদ রং ও স্বাদে অনন্য হওয়ায় ইতোমধ্যেই দেশসেরা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। চলতি মৌসুমে ৪০ জন কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, উন্নত জাত সম্প্রসারণ, রোগবালাই দমন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। পাশাপাশি সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গেলে ফুলবাড়ীয়ার হলুদ আন্তর্জাতিক বাজারেও জায়গা করে নিতে পারে।
কৃষি বিভাগের সহায়তা ও কৃষকের পরিশ্রমে ফুলবাড়ীয়ার লাল মাটি যেন প্রতি বছরই রচনা করছে সোনালি সম্ভাবনার নতুন ইতিহাস।








