সমকামিতার অভিযোগ : ঢাবির শৃঙ্খলাবিধিতে কী রয়েছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি আবাসিক হলে সমকামিতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। একাধিক ঘটনায় প্রশাসনিক তদন্ত, হল কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর প্রশ্ন উঠেছে—এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান শৃঙ্খলাবিধিতে কী ধরনের ব্যবস্থা বা শাস্তির বিধান রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলের একটি কক্ষে অবস্থান করা দুই অতিথির বিরুদ্ধে সমকামী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ সামনে আসে। এর কয়েকদিন আগেই মাস্টারদা সূর্য সেন হলেও একই ধরনের একটি অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। দুটি ঘটনাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
জানা গেছে, ১৯৭৩ সালের ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ’ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তবে এই আদেশ কিংবা আবাসিক হল পরিচালনাবিষয়ক বিধিমালায় সমকামিতাকে পৃথক কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। একইভাবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো শাস্তির বিধানও নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, অতীতে এ ধরনের অভিযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে সামনে না আসায় বিষয়টি আলাদাভাবে শৃঙ্খলাবিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন সাধারণত অসদাচরণ, শৃঙ্খলাভঙ্গ, আবাসিক হলের নিয়ম লঙ্ঘন অথবা ক্যাম্পাসের পরিবেশ বিনষ্টের অভিযোগ তদন্তের মাধ্যমে বিবেচনা করে থাকে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সতর্কীকরণ, হলের আসন বাতিল, হল থেকে বহিষ্কার, এমনকি সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এসব ব্যবস্থার কোনোটিই সমকামিতার জন্য পৃথকভাবে নির্ধারিত নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, ক্যাম্পাসে সংঘটিত যেকোনো ঘটনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিধি ও তদন্তপ্রক্রিয়ার আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং প্রশাসনিক শাস্তির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষই নির্ধারণ করে।
অন্যদিকে দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারায় ‘প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধে’ সংঘটিত যৌন সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ ধারার প্রয়োগ সম্পূর্ণভাবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়।
বিজ্ঞাপন
সূর্য সেন হলের ঘটনা
গত ৩০ জুলাই মাস্টারদা সূর্য সেন হলে প্রথম ঘটনাটি সামনে আসে। হল প্রশাসনের দাবি, একজন আবাসিক শিক্ষার্থী তাঁর কক্ষে বহিরাগত একজনকে নিয়ে আসেন এবং তাদের বিরুদ্ধে সমকামী কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অবস্থানের অভিযোগ ওঠে। পরে হলের শিক্ষার্থীরা ওই ব্যক্তিকে আটক করলে হল প্রশাসন ও হল সংসদের উদ্যোগে দুজনকে শাহবাগ থানায় হস্তান্তর করা হয়।
এই ঘটনার পর অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর আবাসিক আসন তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয় এবং তাঁকে হল থেকে আজীবন বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের প্রাধ্যক্ষ রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় ‘নৈতিক স্থলন’-এর অভিযোগে হল থেকে বহিষ্কারের ক্ষমতা প্রাধ্যক্ষের রয়েছে। তাঁর মতে, অভিযোগটি ওই বিধানের আওতায় বিবেচিত হয়েছে।
শহীদুল্লাহ হলে নতুন বিতর্ক
এরপর গত শনিবার ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে আরেকটি ঘটনা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দেয়। হল সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) ও ছাত্রশিবির নেতা ইব্রাহীম খলিলের কক্ষে থাকা দুই অতিথির বিরুদ্ধে সমকামী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে।
বিজ্ঞাপন
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দুই তরুণকে অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়।
ঘটনার পর হল প্রশাসন এজিএস ইব্রাহীম খলিলের আবাসিক আসন সাময়িকভাবে বাতিল করে এবং পুরো বিষয়টি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করে। প্রশাসন জানিয়েছে, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ প্রসঙ্গে ইব্রাহীম খলিল বলেন, ঘটনাটি তাঁর কক্ষে ঘটলেও এ বিষয়ে তিনি আগে থেকে কিছু জানতেন না।
বিজ্ঞাপন
তদন্ত ঘিরে সংঘর্ষ
ঘটনার তদন্ত চলাকালেই রোববার সন্ধ্যায় শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষের কক্ষে ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষই পরস্পরের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ তোলে এবং দাবি করে, সংঘর্ষে তাদের কয়েকজন আহত হয়েছেন।
নতুন নীতিমালার চিন্তা প্রশাসনের
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক দুটি ঘটনার পর সমকামিতা-সংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করতে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের বিষয়ে চিন্তা করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানিয়েছেন, এ বিষয়ে পৃথক নীতিমালা তৈরির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
উপাচার্য বলেন, বর্তমানে এ ধরনের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদ্যমান বিধিমালায় সমকামিতার বিষয়ে আলাদা কোনো শাস্তির বিধান না থাকায় ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।








