তীব্র গ্যাস সংকটে রাজধানী, বিপাকে গ্রাহকরা

জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের কারণে কক্সবাজারের মহেশখালীতে সামিটের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল চার দিনের জন্য বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায়। আবাসিক গ্রাহকদের পাশাপাশি শিল্প, বাণিজ্যিক ও পরিবহন খাতেও দেখা দিয়েছে সরবরাহ সংকট।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। রাজধানীর আজিমপুর, বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, যাত্রাবাড়ী, ধানমন্ডি ও কলাবাগানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে গ্যাসের তীব্র সংকটের খবর পাওয়া গেছে। যেসব এলাকায় আগে থেকেই গ্যাসের চাপ কম ছিল, সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা তাসফিয়া আক্তার বলেন, গ্যাস দিয়ে রান্না তো চলছিল। সকাল থেকে হঠাৎ করেই গ্যাস পাচ্ছি না। চুলা জ্বলে না, রান্না থেমে যায়। এভাবে চললে তো না খেয়ে থাকতে হবে।
ধানমন্ডির বাসিন্দা রেকসনা বেগম বলেন, গ্যাসের সমস্যা তো আছেই। টিপটিপ করে চুলা জ্বলে, রান্না করতে কষ্ট হয়। এতদিন তো কোনো না কোনোভাবে রান্না চালিয়ে নিতাম। কিন্তু আজ সকাল থেকে রান্না করতে পারছি না। এখন ইলেকট্রিক চুলায় ভরসা করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) জানিয়েছে, ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা থেকে ৭ নভেম্বর বিকেল ৪টা পর্যন্ত মহেশখালীতে সামিটের এলএনজি টার্মিনালের জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ চলবে। এ সময় টার্মিনালটির রিগ্যাসিফিকেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনাল বন্ধ থাকায় জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসতে পারে। অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলএনজি টার্মিনালনির্ভরতায় সরবরাহে ঝুঁকি
বিজ্ঞাপন
দেশে গ্যাসের চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন দিয়ে সেই চাহিদা পুরোপুরি মেটানো যাচ্ছে না। ফলে আমদানি করা এলএনজি গ্যাসে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে।
এ কাজের জন্য মহেশখালীতে রয়েছে দুটি ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ)। আমদানি করা এলএনজি এসব টার্মিনালে প্রক্রিয়াজাত করে গ্যাসে রূপান্তরের পর জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়। কিন্তু দুটি টার্মিনালের যেকোনো একটি বন্ধ থাকলে সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। সামিটের টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণের কারণে এবারও তার প্রভাব পড়েছে।
এ পরিস্থিতি দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিকে আবারও সামনে এনেছে। একটি টার্মিনালের রক্ষণাবেক্ষণ বা কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় গ্যাস উৎপাদন ও আমদানির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। একই সঙ্গে এলএনজি টার্মিনালের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির অপারেশন ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, গতকালও আমরা এলএনজি থেকে ৯৭০ এমএমসিএফডি গ্যাস পেয়েছি। আজকে থেকে ৬০০ এমএমসিএফডি সাপ্লাই দেওয়ার কথা ছিলো কিন্তু আমরা ৫১৪ এমএমসিএফডি পাচ্ছি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, তিতাসের টোটাল ডিমান্ড দুই হাজার এমএমসিএফডির কাছাকাছি। ঢাকা শহরে ১৬০ এমএমসিএফডির মতো বিল পাই আমরা কিন্তু অবৈধ সংযোগ থাকায় বেশি গ্যাস চলে যায়। তবে এফএসআরইউ রক্ষণাবেক্ষণে থাকায় গ্যাসের সরবরাহ কমেছে।
অর্থাৎ, নির্ধারিত সরবরাহের চেয়েও কম গ্যাস পাওয়ায় বিতরণ ব্যবস্থায় চাপ আরও বেড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আবাসিক গ্রাহকদের রান্নার কাজে।
নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের পরামর্শ বিশেষজ্ঞের
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, কিছুদিন আগে একবার সমস্যা তৈরি হয়েছিল, অনেকদিন ধরে গ্যাস সংকট ছিলো। তখন সরকার নতুন এফএসআরইউ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন এই এফএসআরইউ না স্থাপন পর্যন্ত এই সমস্যা তৈরি হবেই।
তিনি বলেন, একটা এফএসআরইউ এলে পরিস্থিতি ঠিক হবে। এরপর আরেকটা এলে ওটা স্ট্যান্ড বাই থাকবে, যদি কোনোটায় সমস্যা দেখা দেয় তখন ওটা কাজ শুরু করবে। আর যতদ্রুত সম্ভব এফএসআরইউ মেরামত করে প্রোডাকশনে ফেরাতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল স্থাপনের পাশাপাশি বিদ্যমান অবকাঠামোর নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোও জরুরি। একটি টার্মিনাল বন্ধ হলেই যাতে জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি না হয়, সে জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত সক্ষমতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানিনির্ভরতার চাপও কমানো সম্ভব হবে। আপাতত সামিটের টার্মিনাল মেরামত শেষ করে দ্রুত কার্যক্রমে ফেরানোই সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।








