চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধ নতুন মামলায় তোলা যাবে না: হাইকোর্ট

সর্বোচ্চ আদালতে কোনো বিরোধ চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়ে গেলে তা নতুন বা পরবর্তী মামলা করে পুনরায় উত্থাপন করা যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত বলেছেন, কোনো বিরোধ বা ঘটনা সম্পর্কে আগে থেকে অবগত থাকলেই সেটি প্রতারণা হিসেবে গণ্য হবে না। প্রতারণার অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে সুনির্দিষ্ট, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
সম্পত্তি-সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি বিরোধে দায়ের করা সিভিল রিভিশনের রুল খারিজ করে দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. আলী রেজার একক বেঞ্চ গত ৩০ জুলাই রায় ঘোষণা করেন। পরে ২১ সেপ্টেম্বর রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়।
‘দিন ইসলাম সিকদার বনাম আফরোজা বেগম ও অন্যান্য’ মামলাটি সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫ হিসেবে নথিভুক্ত।
মামলার নথি অনুযায়ী, আবদুর রহমান ১৯৫৫ সালে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বিতর্কিত সম্পত্তি কেনেন। পরে ১৯৮৭ সালে তিনি সাইফুজ্জামানের কাছে সম্পত্তিটি ভাড়া দেন। ভাড়া বকেয়া থাকায় ১৯৯৭ সালে আবদুর রহমান উচ্ছেদ ও বকেয়া ভাড়া আদায়ের মামলা করেন। অন্যদিকে সাইফুজ্জামান সম্পত্তির সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের দাবিতে মামলা করেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
দুই মামলার একসঙ্গে শুনানি শেষে উচ্ছেদের মামলাটি ডিক্রি হয় এবং সুনির্দিষ্ট কার্য সম্পাদনের মামলাটি খারিজ হয়ে যায়। এর বিরুদ্ধে সাইফুজ্জামান রিভিশন ও লিভ পিটিশন করলেও সেগুলো খারিজ হয়।
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী সময়ে বিতর্কিত সম্পত্তি আইএফআইসি ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ গ্রহণ ও নিলাম কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নতুন বিরোধ দেখা দেয়। এ-সংক্রান্ত মামলায় হাইকোর্ট ২০০৮ সালে আবদুর রহমানের ওপর ঋণের দায় আরোপের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন। পরে ২০১২ সালে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ লিভ পিটিশন খারিজ করে হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এরপর ২০২৩ সালে বিতর্কিত সম্পত্তি নিয়ে নতুন মামলা করেন বাদী। মামলাটি পরে টাইটেল স্যুট হিসেবে পরিচিত হয়। বিবাদীপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির ওর্ডার ৭ রুল ১১ এবং ১১ ও ১৫১ ধারায় আরজি খারিজের আবেদন করলে বিচারিক আদালত ২০২৩ সালের ৭ মার্চ তা মঞ্জুর করেন। ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি আপিল আদালতও ওই সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন।
এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন দায়ের করেন বাদী। ওই রিভিশনের ওপর জারি করা রুলের শুনানি শেষে হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেন।
বিজ্ঞাপন
প্রতারণা প্রমাণে শুধু পূর্বজ্ঞান যথেষ্ট নয়
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, অনুমান বা ধারণার ভিত্তিতে প্রতারণার অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অভিযোগটি সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপন করতে হবে এবং স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে তা প্রমাণ করতে হবে।
আদালত বলেন, কোনো অভিযোগ বা বিরোধ সম্পর্কে আগে থেকে জানা থাকাই প্রতারণা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। আদালত বা অন্য কোনো পক্ষকে বিভ্রান্ত করে বেআইনি সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন বা ভুলভাবে উপস্থাপনের বিষয়টি প্রমাণিত হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
বাদীপক্ষ ১৯৯২ সালের একটি লিগ্যাল নোটিশ ও চিঠির অনুলিপি দিয়ে দাবি করে, আবদুর রহমান বন্ধক-সংক্রান্ত অভিযোগ সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিলেন। তবে হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন, পূর্ববর্তী ঋণ-সংক্রান্ত কার্যক্রমে এমন প্রতারণার অভিযোগ উত্থাপিত বা বিচারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ফলে পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে আগের কার্যক্রমকে প্রতারণাজনিত হিসেবে অকার্যকর ঘোষণা করার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি আদালত পাননি।
চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়া বিরোধ পুনরায় তোলার সুযোগ নেই
হাইকোর্ট বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতে কোনো বিষয় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হলে মামলার চূড়ান্ততার নীতি অনুযায়ী তা পুনরায় উত্থাপনের সুযোগ সীমিত। আইনস্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ না করে নতুন বা পার্শ্ববর্তী মামলার মাধ্যমে আগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তকে আবার প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না।
বিজ্ঞাপন
এ বিষয়ে আদালত ‘আব্দুল জলিল বনাম ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, ৭ এমএলআর (এডি) ২৫৮’ মামলার নজির উল্লেখ করেন।
আদালত আরও বলেন, নিম্ন আদালতগুলো প্রাসঙ্গিক নথি, পূর্ববর্তী রায় এবং উচ্চতর আদালতের সিদ্ধান্তের বাধ্যতামূলক প্রভাব বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এসব সিদ্ধান্তে এমন কোনো আইনগত ত্রুটি বা বিচারিক অসংগতি পাওয়া যায়নি, যাতে রিভিশন আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয়।
মামলার সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে হাইকোর্ট সিভিল রিভিশন নং ৬৬১/২০২৫-এর রুল খারিজ করেন। একই সঙ্গে মামলায় কোনো স্থগিতাদেশ বা স্থিতাবস্থার আদেশ দেওয়া হয়ে থাকলে তা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।








