Logo

স্কুলে শুরু হচ্ছে ‘ভর্তিযুদ্ধ’, বাড়ছে কোচিং বাণিজ্যের আশঙ্কা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ মার্চ, ২০২৬, ১৫:১৪
স্কুলে শুরু হচ্ছে ‘ভর্তিযুদ্ধ’, বাড়ছে কোচিং বাণিজ্যের আশঙ্কা
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ এক দশক পর দেশে বিদ্যালয়গুলোতে আবার ফিরে আসছে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি ঘোষণা করেছেন, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তিতে লটারি পদ্ধতি বাতিল করে পরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করা হবে। তবে এই ঘোষণার পরই অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ, কারণ মেধা যাচাইয়ের আড়ালে ফের শুরু হতে পারে ভর্তি বাণিজ্য ও প্রভাবশালীদের তদবির।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষা খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০২১ সাল থেকে নামকরা স্কুলগুলোতে ভর্তি পরীক্ষার বদলে লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী বাছাই শুরু হয়। শুরুতে সরকারি স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে এটি চালু হলেও পরে বেসরকারি স্কুলেও বিস্তৃত হয়। তবে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরীক্ষা আবার চালু হলে নামকরা স্কুলগুলোর ‘ভর্তিযুদ্ধ’ পুনরায় জোরদার হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত বছর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একটি গোপন তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে দুই যুগ ধরে ভর্তির আড়ালে শতকোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯-২০২৫ সালের মধ্যে ৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী অবৈধভাবে ভর্তি হয়েছে। প্রতিটি ভর্তিতে লেনদেনের পরিমাণ ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা, যা মোট ৩১৩ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এই বাণিজ্যে ম্যানেজিং কমিটি থেকে অধ্যক্ষ পর্যন্ত প্রভাবশালীদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট জড়িত ছিল।

শিক্ষামন্ত্রীর মতে, লটারিতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষাবিদরা মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা চালু হলে কোচিং ব্যবসা, আর্থিক বৈষম্য এবং সামাজিক চাপ পুনরায় বেড়ে যাবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ড. তৌহিদুল হক বলেন, ভর্তি পরীক্ষা মানেই শুধু মেধা যাচাই নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোচিং নির্ভরতা, ভর্তি বাণিজ্য এবং সামাজিক চাপ। সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধুমাত্র পদ্ধতি পরিবর্তন করলে পুরোনো সংকট নতুনভাবে ফিরে আসতে পারে।

বিজ্ঞাপন

অভিভাবকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভিকারুননিসা নূন স্কুলের এক অভিভাবক বলেন, স্কুলে কোচিং না করলে শিক্ষার্থীদের নম্বর কমানো, চাপ তৈরি হওয়া—সবই দেখা যায়। ভর্তি পরীক্ষা শুরু হলে কোচিং ব্যবসা নতুনভাবে জোরদার হবে।

বর্তমান লটারির মাধ্যমে ভর্তি প্রক্রিয়া শিশুদের ওপর অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমায় এবং নামি স্কুলে প্রবেশের সুযোগ সমানভাবে ভাগ করে দেয়।

বিজ্ঞাপন

তবে শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেন, পরীক্ষানির্ভর ভর্তি চালু হলে শিশুরা ছোটবেলা থেকেই উচ্চ প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের আত্মবিশ্বাস এবং সৃজনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

মাউশির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে মোট শূন্য আসন ছিল ১১ লাখ ৯৩ হাজার। বিপরীতে আবেদন জমা পড়ে ১০ লাখ ৫৬ হাজার, যার মধ্যে নামকরা সরকারি স্কুলে ১ আসনের জন্য ৬ জন, বেসরকারি স্কুলে ১৫-২০ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। আর সাধারণ ও মাঝারি মানের স্কুলগুলোতে তুলনামূলকভাবে শিক্ষার্থী কম থাকায় বৈষম্য আরও বাড়ছে।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা চালু করলে শিক্ষার্থীদের জন্য লটারির তুলনায় চাপ ও বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পাবে। তাই শিশুদের জন্য এলাকায় ভিত্তিক স্কুলিং বা লটারি পদ্ধতি বজায় রাখাই বেশি যৌক্তিক এবং ন্যায্য হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD