এআইয়ের যুগে বদলে যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এখন আর শুধু প্রযুক্তির বিষয় নয়; এটি ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমের কাজের ধরন, পাঠকের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস এবং ভবিষ্যতের সংবাদ ব্যবসাকেও বদলে দিচ্ছে। সংবাদ সংগ্রহ থেকে শুরু করে লেখা, সম্পাদনা, তথ্য যাচাই, অনুবাদ, বিতরণ—প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়টার্স ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব জার্নালিজম দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতায় এআইয়ের প্রভাব নিয়ে কাজ করছে। ২০১৬ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি পর্যবেক্ষণ করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে সংবাদ সংগ্রহ, তৈরি, যাচাই ও বিতরণের পাশাপাশি মানুষের সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস বদলে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের মার্চে এআই নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত গবেষণা এবং পরবর্তী সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক ও ফ্যাক্টচেকারদের অভিজ্ঞতা থেকে সংবাদমাধ্যমের সামনে তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতার বেশ কিছু দিক স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রেও এসব অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়।
সংবাদ পাওয়ার নতুন দরজা চ্যাটবট
বিজ্ঞাপন
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের গবেষণায় উঠে এসেছে, এআই চ্যাটবট ধীরে ধীরে মানুষের সংবাদ পাওয়ার একটি নতুন মাধ্যম হয়ে উঠছে। আগে কোনো ঘটনা জানতে মানুষ সাধারণত গুগলে সার্চ করত কিংবা সরাসরি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে যেত। এখন অনেকেই একই কাজের জন্য চ্যাটজিপিটি বা গুগল জেমিনির মতো এআই চ্যাটবটের দ্বারস্থ হচ্ছেন।
এখানেই সংবাদমাধ্যমের জন্য তৈরি হচ্ছে বড় প্রশ্ন। একজন পাঠক যদি কোনো খবরের বিষয়ে সরাসরি সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে না গিয়ে চ্যাটবটকে প্রশ্ন করেন এবং সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় উত্তর পেয়ে যান, তাহলে তিনি কেন সেই সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে যাবেন?
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এই পরিবর্তন শুধু পাঠকের আচরণের পরিবর্তন নয়; ভবিষ্যতের সংবাদ ব্যবসার জন্যও এটি বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সংবাদমাধ্যমের আয়, পাঠকসংখ্যা, বিজ্ঞাপন এবং সাবস্ক্রিপশন—সবকিছুর সঙ্গে ওয়েবসাইটে পাঠকের উপস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে।
নিউজরুমেও বাড়ছে এআইয়ের ব্যবহার
বিজ্ঞাপন
এআইয়ের প্রভাব শুধু পাঠকের দিকেই সীমাবদ্ধ নয়। নিউজরুমের কাজেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় বিপুল পরিমাণ তথ্য, নথি ও ডেটা দ্রুত বিশ্লেষণে এআই গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে উঠতে পারে।
হাজার হাজার পৃষ্ঠা নথি পর্যালোচনা, তথ্যের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করা কিংবা বড় ডেটাসেট থেকে সম্ভাব্য অসংগতি শনাক্ত করার মতো কাজে এআই সাংবাদিকদের সময় বাঁচাতে পারে। ফলে কঠিন অনুসন্ধানেও প্রযুক্তিটি একজন সহায়ক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
তবে এআইকে সাংবাদিকের বিকল্প হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং তথ্য খোঁজা ও বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে সম্ভাব্য সূত্র শনাক্ত করার কাজে এটিকে সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের বড় চ্যালেঞ্জ ভুয়া তথ্য
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে এআই ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হয়ে উঠছে মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশন।
এআই ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরি বা পুরোনো ফটোকার্ড পরিবর্তন, সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার, কৃত্রিম ছবি-ভিডিও তৈরি এমনকি কথোপকথন বা কলরেকর্ড নকল করার ঘটনাও সামনে আসছে। এসব কনটেন্টের কোনো কোনোটি এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে তৈরি হচ্ছে যে যাচাই ছাড়া তা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
মিসইনফরমেশন বলতে সাধারণত ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়াকে বোঝায়। আর ডিসইনফরমেশন হলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই দুই ধরনের তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় সংবাদমাধ্যমের জন্য শক্তিশালী ফ্যাক্টচেকিং ব্যবস্থা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।
ফ্যাক্টচেকিংয়েও এআই
বিজ্ঞাপন
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের সম্মেলনে ব্রাজিল, যুক্তরাজ্য ও স্পেনের ফ্যাক্টচেকাররা এআই ব্যবহার করে মিসইনফরমেশন মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।
স্পেনের ফ্যাক্টচেকাররা জানিয়েছেন, তারা অন্য ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন এবং কনটেন্ট তৈরিতেও বিভিন্ন এআই টুল ব্যবহার করছেন। ব্রাজিলে এমন একটি নিউজরুম টুল তৈরি করা হয়েছে, যা রিয়েল টাইমে ফ্যাক্টচেকিংয়ে সহায়তা করতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ যে প্রযুক্তি ভুয়া তথ্য তৈরির সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, একই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেই সেই তথ্য শনাক্ত ও যাচাইয়ের ব্যবস্থাও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রতিযোগিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ হলো—এআইকে চূড়ান্ত তথ্যের উৎস না বানিয়ে সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও প্রকাশনার আগে মানবিক যাচাই অপরিহার্য।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশের নিউজরুমে কী হচ্ছে
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ছবি তৈরি, তথ্য সংক্ষেপ, বানান ও বাক্য সংশোধন, ডেটা বিশ্লেষণ, ভয়েস টাইপিং, নিউজ এডিটিং এবং অনুবাদের মতো বিভিন্ন কাজে এখন এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা দরকার এডিটিং ও অনুবাদের ক্ষেত্রে। কারণ এআই অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভুল তথ্য দিতে পারে। কোনো শব্দের অর্থ পরিবর্তন, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বদলে দেওয়া কিংবা অনুবাদের সময় এমন বাক্য তৈরি করা সম্ভব, যা মূল বক্তব্যের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিজ্ঞাপন
শুরুর দিকে কিছু সংবাদমাধ্যম এআইকে দেওয়া প্রশ্ন, প্রম্পট কিংবা এআইয়ের তৈরি উত্তরের অংশও সরাসরি সংবাদে ব্যবহার করেছে। সময়ের সঙ্গে নিউজরুমের সাব-এডিটর ও সম্পাদনা দলের মানবিক যাচাই যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে।
এখানেই মানুষের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এআইয়ের তৈরি কনটেন্টে এমন ভুল বা অসংগতি থাকতে পারে, যা মানবিক সম্পাদনা ছাড়া প্রকাশিত হলে সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সবচেয়ে বড় হুমকি হয়তো পাঠক
এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে শুধু কনটেন্ট তৈরির বিষয়টি দেখলে হবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—পাঠক কোথা থেকে সংবাদ নেবেন?
মিসইনফরমেশন ও ডিসইনফরমেশনের বিস্তারের কারণে অনেক পাঠক ইতিমধ্যে সব ধরনের অনলাইন সংবাদকে সন্দেহের চোখে দেখছেন। একই সময়ে কেউ কেউ সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে না গিয়ে সরাসরি এআই চ্যাটবটের কাছে উত্তর খুঁজছেন।
ফলে সংবাদমাধ্যমের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। একদিকে বিশ্বাসযোগ্যতা ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে এমন একটি বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে যেখানে পাঠক সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটের পরিবর্তে এআই প্ল্যাটফর্মকে সংবাদ জানার প্রধান মাধ্যম হিসেবে বেছে নিতে পারেন।
কনটেন্টের মালিকানা নিয়েও সংঘাত
এআইয়ের উত্থানের সঙ্গে সংবাদমাধ্যম ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কনটেন্টের মালিকানা ও ব্যবহারের প্রশ্নটিও সামনে এসেছে।
বিশ্বের বড় সংবাদমাধ্যমগুলো অভিযোগ করছে, তাদের অনুমতি ছাড়া সাংবাদিকতার কনটেন্ট এআই মডেল প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ নিয়ে বিভিন্ন দেশে আইনি বিরোধ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে কিছু সংবাদমাধ্যম আবার এআই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তির ভিত্তিতে অংশীদারত্বেও যাচ্ছে।
গত ৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য সিয়াটল টাইমস ও নিউজডে এআই সিস্টেম প্রশিক্ষণের জন্য অনুমতি ছাড়া তাদের সাংবাদিকতার কনটেন্ট কপি করার অভিযোগে ওপেনএআই ও মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে ফেডারেল আদালতে মামলা করে।
তাদের অভিযোগ, সংবাদপত্র দুটির ওয়েবসাইট থেকে কনটেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে পেওয়ালের আড়ালে থাকা কনটেন্টও রয়েছে। এতে সাবস্ক্রাইবার কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে তারা।
মামলায় সিয়াটল টাইমস ও নিউজডে এমন নির্দেশনাও চেয়েছে, যাতে তাদের কনটেন্টের কপি এবং সেই কনটেন্ট ব্যবহার করা প্রশিক্ষণ ডেটাসেট বা এআই মডেল বিলুপ্ত করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অন্যদিকে ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গ্রুপ ও ওপেনএআইয়ের মধ্যে সম্প্রতি অংশীদারত্বমূলক চুক্তি হয়েছে। এর আওতায় চ্যাটজিপিটিতে এক্সপ্রেস গ্রুপের অংশগ্রহণকারী প্রকাশনাগুলোর কনটেন্ট উপস্থাপনের পদ্ধতি আরও উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন
অর্থাৎ সম্পর্কটি শুধু সংঘাতের নয়; কোথাও মামলা, কোথাও আবার চুক্তি—দুই পথেই এগোচ্ছে সংবাদমাধ্যম ও এআই প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক।
বাংলাদেশের সামনে এখন যে প্রশ্ন
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম এআইকে কীভাবে ব্যবহার করবে?
এআইকে ভয় পাওয়ার চেয়ে এর ব্যবহারকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে আনা বেশি জরুরি। কোন কাজে এআই ব্যবহার করা যাবে, কোন ক্ষেত্রে মানবিক যাচাই বাধ্যতামূলক হবে, এআই দিয়ে তৈরি ছবি বা কনটেন্ট কীভাবে চিহ্নিত করা হবে এবং কোনো তথ্য প্রকাশের আগে কীভাবে যাচাই করা হবে—এসব বিষয়ে প্রতিটি নিউজরুমের নিজস্ব নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাংবাদিক ও সম্পাদনা বিভাগের কর্মীদের এআই ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ফ্যাক্টচেকিং টিমকে আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং প্রয়োজন হলে অন্য ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআইকে সাংবাদিকতার বিকল্প নয়, সাংবাদিকের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ হয়তো এআইবিহীন নয়। বরং ভবিষ্যতের সফল সংবাদমাধ্যম হবে সেই প্রতিষ্ঠান, যারা প্রযুক্তির গতি ও মানুষের বিচারবোধ—দুটিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারবে। বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো এআই নিয়ে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে, সেদিকে নজর রেখে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা শুধু কে দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করতে পারে—তা নিয়ে হবে না। বরং কে সবচেয়ে দ্রুত, নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে সংবাদ দিতে পারে, সেই প্রতিযোগিতাই হবে সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যতের মূল লড়াই।








