করোনার ক্ষত না শুকাতেই নতুন ভাইরাস আতঙ্কে বিশ্ব

আবারও প্রাণঘাতী ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দিয়েছে মধ্য আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে নীরবে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য মহলে। বিশেষ করে গৃহযুদ্ধ, সংঘাত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটে থাকা অঞ্চলগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিজ্ঞাপন
এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জন সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তাদের মধ্যে অন্তত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশঙ্কা করছে, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ অনেক দুর্গম এলাকায় এখনো যথাযথ পরীক্ষা ও চিকিৎসা কার্যক্রম পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
আরও পড়ুন: সৌদি আরবে ঈদুল আজহার তারিখ ঘোষণা
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও এটি করোনাভাইরাসের মতো বৈশ্বিক মহামারিতে রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। কারণ ইবোলা ভাইরাস সাধারণত দ্রুত শনাক্ত করা যায় এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখা সম্ভব হয়। এছাড়া এই ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না।
বিজ্ঞাপন
এর আগে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকাজুড়ে ভয়াবহ ইবোলা প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল। সে সময় প্রায় ২৮ হাজার ৬০০ মানুষ আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে সংক্রমণ মূলত আফ্রিকার নির্দিষ্ট অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যানডেমিক সায়েন্সেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ডক্টর আমান্ডা রোজেক বলেছেন, বৈশ্বিক মহামারির আশঙ্কা খুব বেশি না থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি মোটেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। এটি নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও দ্রুত পদক্ষেপ জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলার বিরল “বুন্দিবুগিও” প্রজাতি। এর আগে ২০০৭ ও ২০১২ সালে মাত্র দুইবার এই ধরনের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রজাতিতে আক্রান্তদের প্রায় ৩০ শতাংশের মৃত্যু ঘটে।
বিজ্ঞাপন
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, বুন্দিবুগিও প্রজাতির বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট ওষুধ নেই। এমনকি প্রচলিত ইবোলা শনাক্তকরণ পরীক্ষাও অনেক ক্ষেত্রে এই ভাইরাস ধরতে ব্যর্থ হচ্ছে। কঙ্গোতে প্রথম দিকের কয়েকটি পরীক্ষার ফল নেতিবাচক এলেও পরে উন্নত পরীক্ষাগারে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ট্রুডি ল্যাং বলেছেন, বর্তমানে বুন্দিবুগিও প্রজাতি মোকাবিলা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ইবোলায় আক্রান্ত হওয়ার দুই থেকে ২১ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে। শুরুতে জ্বর, মাথাব্যথা ও দুর্বলতা দেখা দিলেও পরে বমি, ডায়রিয়া, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। নির্দিষ্ট ওষুধ না থাকায় আক্রান্তদের মূলত সহায়ক চিকিৎসার মাধ্যমে সেবা দেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত আলাদা রাখা, সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং নিরাপদ চিকিৎসা ও দাফন নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। তবে চলমান সংঘাত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের সংকটের কারণে কঙ্গোর অনেক এলাকায় কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, প্রতিবেশী দেশ উগান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও রুয়ান্ডাতেও সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে উগান্ডায় দুইজনের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে আশার দিকও রয়েছে। কঙ্গোর স্বাস্থ্য বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে ইবোলা মোকাবিলার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত আন্তর্জাতিক সহায়তা, কার্যকর নজরদারি এবং সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
সূত্র: বিবিসি








