সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকার পাহাড় গড়ল নতুন ইতিহাস

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থ ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকগুলোর আমানত ৪১ শতাংশ বেড়ে ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) প্রকাশিত সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের (এসএনবি) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার ৭৬০ কোটিরও বেশি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সুইস ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশিদের আমানতের এই পরিমাণ অতীতের সব রেকর্ডের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এর আগে ২০২১ সালে বাংলাদেশি আমানত সর্বকালের সর্বোচ্চ ৮৭১ দশমিক ১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছিল। ফলে এবারের অঙ্কটি সেই রেকর্ডের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ব্যাংকগুলোর আমানত বৃদ্ধিতেই মূল উল্লম্ফন
বিজ্ঞাপন
এসএনবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি আমানত বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোর অর্থ জমা রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি। ২০২৪ সালে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল ৫৭৬ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। এক বছরের ব্যবধানে তা ৪৩ শতাংশ বেড়ে ২০২৫ সালে ৮২২ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে উন্নীত হয়েছে।
ফলে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট মোট আমানতের প্রায় পুরো অংশই এখন ব্যাংক খাতের দখলে। সর্বশেষ হিসাবে মোট আমানতের ৯৮ দশমিক ৬ শতাংশই বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে জমা রাখা হয়েছে। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৯৭ দশমিক ৮ শতাংশ। অথচ কয়েক বছর আগে এই অনুপাত অনেক কম ছিল। ২০২৩ সালে তা ছিল ২০ শতাংশ এবং ২০২১ সালে ৩৫ শতাংশ।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় যে সাম্প্রতিক বৃদ্ধির পেছনে ব্যক্তিগত আমানতের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যাংকিং খাতের অবদানই বেশি।
ব্যক্তিগত হিসাবের আমানত কমেছে
যেখানে ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে, সেখানে ব্যক্তিগত গ্রাহকদের জমাকৃত অর্থের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। এসএনবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশি ব্যক্তিগত হিসাবগুলোতে জমা ছিল ১২ দশমিক ৬ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। ২০২৫ সালে তা প্রায় ১০ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১১ দশমিক ৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
বিজ্ঞাপন
অর্থাৎ সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধির পরিসংখ্যানে ব্যক্তিগত গ্রাহকদের অবদান তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ
সুইস ব্যাংকে আমানতের পরিমাণ বিবেচনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বর্তমানে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ আমানত নিয়ে শীর্ষে রয়েছে ভারত। যদিও আগের বছরের তুলনায় ভারতীয় ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর আমানত ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের আমানত ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৩৪ দশমিক ২ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।
এদিকে আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। দেশটি থেকে সুইস ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ প্রায় ৪৮ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও মোট অঙ্ক এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ২০২৫ সালে আফগানিস্তানের ব্যক্তি ও ব্যাংকগুলোর মোট আমানত ছিল ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
বিজ্ঞাপন
অতীতের পরিসংখ্যান কী বলছে?
সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংক আমানতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অঙ্কটি ছিল ২০২১ সালে। সে বছর আমানতের পরিমাণ ৮৭১ দশমিক ১ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁতে পৌঁছায়।
এর আগে ২০২০ সালে বাংলাদেশিদের জমা রাখা অর্থ ছিল ৫৬৩ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫ হাজার ২০০ কোটির বেশি। ২০১৯ সালে এই অঙ্ক ছিল ৬০৩ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
বিজ্ঞাপন
আরও পেছনে গেলে দেখা যায়, ২০১৮ সালে বাংলাদেশিদের সুইস ব্যাংক আমানত ছিল প্রায় ৬২০ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ এবং ২০১৭ সালে ছিল ৬৬১ দশমিক ৯ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ।
এই ধারাবাহিক পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, মাঝেমধ্যে ওঠানামা থাকলেও সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ-সংশ্লিষ্ট অর্থের পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদে উল্লেখযোগ্য অবস্থান ধরে রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
কী অন্তর্ভুক্ত থাকে এই পরিসংখ্যানে?
এসএনবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের ‘মোট দায়’ বা মোট আমানতের হিসাবে শুধু ব্যক্তিগত হিসাব নয়, বরং বাংলাদেশি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য সংস্থার জমা রাখা অর্থও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ফলে প্রকাশিত পরিসংখ্যানকে কেবল ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এতে ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ধরনের তহবিলের তথ্য একত্রে বিবেচনা করা হয়।
বিজ্ঞাপন
কেন সুইস ব্যাংক এত জনপ্রিয়?
দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোকে অর্থ সংরক্ষণের নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। এর অন্যতম কারণ দেশটির কঠোর ব্যাংকিং গোপনীয়তা নীতি।
সুইস আইন অনুযায়ী, গ্রাহকদের তথ্য সুরক্ষায় ব্যাংকগুলোকে কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হয়। ফলে কোনো গ্রাহকের অর্থের উৎস, পরিমাণ কিংবা পরিচয় সম্পর্কে তথ্য প্রকাশে কঠোর বিধিনিষেধ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে চাপ ও সমালোচনা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক আমানতকারী তাদের অর্থ অন্য দেশেও স্থানান্তর করছেন।








