Logo

সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কে বিয়ে না হলেই ধর্ষণ বলা যাবে না: এলাহাবাদ হাইকোর্ট

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০ জুন, ২০২৬, ১৯:৪২
সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কে বিয়ে না হলেই ধর্ষণ বলা যাবে না: এলাহাবাদ হাইকোর্ট
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিন ধরে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শারীরিক সম্পর্ককে কেবল বিয়ের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে ধর্ষণ হিসেবে আখ্যায়িত করা যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের এলাহাবাদ হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা সম্পর্ক পরবর্তীতে ভেঙে গেলে বা বিয়ে না হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধর্ষণের অভিযোগে পরিণত হয় না।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বিচারপতি বিবেক কুমার সিংয়ের একক বেঞ্চ এ-সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানি শেষে অভিযুক্ত সঞ্জয় সরোজ ওরফে সঞ্জয় কুমারের বিরুদ্ধে চলমান ধর্ষণসহ বিভিন্ন ফৌজদারি অভিযোগের বিচারিক কার্যক্রম বাতিল করেন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত সম্পর্কের প্রকৃতি, সম্মতি এবং প্রতারণার অভিযোগের আইনি ভিত্তি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরেন।

রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, মামলার নথি ও উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে অভিযোগকারী নারী ও অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে সম্পর্কটি দীর্ঘ সময় ধরে চলমান ছিল এবং তা উভয়ের সম্মতির ভিত্তিতেই গড়ে উঠেছিল।

আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি স্বাধীনভাবে ও সচেতন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে শারীরিক সম্পর্কে জড়ান, তাহলে পরবর্তীতে সম্পর্কের পরিণতি প্রত্যাশিত না হলে সেই সম্পর্ককে সহজে ধর্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

বিজ্ঞাপন

মামলার বিবরণে জানা যায়, ২০১৪ সালে প্রতাপগড়ের এক নারী উচ্চশিক্ষা ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে প্রয়াগরাজে যান। সেখানে তার এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি, তাকে পড়াশোনা ও বাসস্থানের বিষয়ে সহায়তা করেন।

এই পরিচয়ের সূত্র ধরে দুজনের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় এবং পরবর্তীতে তাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, সম্পর্কটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে অব্যাহত ছিল।

বিজ্ঞাপন

২০১৯ সালে ওই নারী থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তার দাবি ছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তি বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, কিন্তু পরে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান।

অভিযোগে তিনি আরও বলেন, তাকে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে এবং শারীরিকভাবে নির্যাতনও করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে অভিযোগকারী দাবি করেন, অভিযুক্ত তার সঙ্গে একত্রে বসবাস করতেন এবং ব্যক্তিগত কিছু ভিডিও ধারণ করে তাকে চাপে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

তবে মামলার তদন্তে চিকিৎসা পরীক্ষায় শারীরিক আঘাতের সুস্পষ্ট কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ তদন্ত শেষে চার্জশিট দাখিল করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি এলাহাবাদ হাইকোর্টে আবেদন করেন। তিনি আদালতের কাছে দাবি করেন, সম্পর্কটি ছিল সম্পূর্ণ সম্মতিপূর্ণ এবং দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ফলে পরবর্তীতে বিয়ে না হওয়ার কারণে ধর্ষণের অভিযোগ আইনগতভাবে টেকসই নয়।

শুনানিকালে আদালত মামলার বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখে এবং সম্পর্কের সময়কাল, পারস্পরিক যোগাযোগ ও ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করেন।

রায়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের উল্লেখ করা হয়। আদালত বলেন, বিয়ের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে ধর্ষণের অভিযোগ তখনই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, যখন স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবে যে শুরু থেকেই অভিযুক্তের প্রতিশ্রুতি ছিল প্রতারণামূলক এবং সেই মিথ্যা আশ্বাস দিয়েই সম্মতি আদায় করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ, যদি কোনো ব্যক্তি শুরু থেকেই বিয়ে করার ইচ্ছা না রেখে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করেন, তাহলে তা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু সম্পর্কের স্বাভাবিক অগ্রগতির মধ্যে পরবর্তীতে বিয়ে না হওয়ার ঘটনা সবসময় অপরাধের পর্যায়ে পড়ে না।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর প্রতিটি ঘটনায় যদি ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়, তাহলে ফৌজদারি আইনের অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিচারপতি বলেন, সম্মতিপূর্ণ সম্পর্ক এবং প্রতারণার মাধ্যমে আদায় করা সম্মতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিচারিক প্রক্রিয়ায় সেই পার্থক্য নির্ধারণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

তার মতে, কোনো সম্পর্কের সমাপ্তি বা বিয়ে না হওয়ার ঘটনা একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। প্রতিটি মামলার বাস্তবতা, পরিস্থিতি এবং প্রমাণের ভিত্তিতেই আইনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

সব তথ্য-প্রমাণ ও আইনি দিক পর্যালোচনা শেষে আদালত সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে সংশ্লিষ্ট মামলায় ধর্ষণের অভিযোগে বিচারিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভিত্তি নেই। ফলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চলমান ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতে বিয়ের প্রতিশ্রুতি এবং সম্মতিপূর্ণ সম্পর্কসংক্রান্ত মামলাগুলোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। একই সঙ্গে সম্মতি, প্রতারণা এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের আইনি ব্যাখ্যা নিয়ে নতুন করে আলোচনারও জন্ম দিয়েছে এই রায়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD