Logo

পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই মাশহাদে দাফন হলো খামেনির মরদেহ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০৯
পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই মাশহাদে দাফন হলো খামেনির মরদেহ
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নিহত তার পরিবারের চার সদস্যকেও সেখানে সমাহিত করা হয়। এদিকে সংঘাতের বিস্তার, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া এবং উভয় পক্ষের কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

সাত দিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান শেষে বৃহস্পতিবার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে খামেনির দাফন সম্পন্ন হয়। দাফন উপলক্ষে শহরের বিভিন্ন সড়কে হাজারো মানুষ জড়ো হন। অনেককে জাতীয় পতাকা হাতে শোক মিছিলে অংশ নিতে দেখা যায়। সমাবেশে কিছু বিক্ষোভকারীর হাতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে হুমকিমূলক স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ডও দেখা গেছে।

এর মধ্যেই যুদ্ধক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, বৃহস্পতিবার তারা ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির আশপাশের কয়েকটি এলাকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এর আগের দিন বুধবার আরও ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলার কথা জানানো হয়েছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

তবে এসব অভিযানের বিষয়ে সর্বশেষ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত দুই দিনে দেশটির পাঁচটি প্রদেশে মার্কিন হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত এবং ৭৮ জন আহত হয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছাকাছি কয়েকটি স্থাপনাও হামলার আওতায় এসেছে। প্রদেশটির উপ-গভর্নরের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বিস্ফোরণে বিভিন্ন স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যদিও এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি করেছে। তেহরান জানিয়েছে, কুয়েত, বাহরাইন ও কাতারে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া জর্ডান ও ইরাকের কিছু এলাকায়ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কথা দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশও নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করেছে। অন্যদিকে কাতার সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সতর্কতা জারি করেছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেছে, রাজধানী তেহরানের সঙ্গে মাশহাদের সংযোগকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু এবং একটি রেলপথ মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তারা সর্বশেষ হামলাকে ‘গুরুতর যুদ্ধাপরাধ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, গত কয়েক ঘণ্টায় ইরানের ভেতরে নতুন কোনো মার্কিন হামলা পরিচালিত হয়নি। ফলে উভয় পক্ষের দাবির মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে তথ্যগত অসামঞ্জস্যও দেখা যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সংঘাতের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালীতে। আন্তর্জাতিক ট্যাংকার মালিকদের সংগঠন ইন্টারট্যাঙ্কোর মেরিন পরিচালক ফিল বেলচার জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক উত্তেজনার পর এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে।

তার তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০টি জাহাজ হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করছে। অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এ সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০টি। আর চলতি বছরের শুরুতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকাকালে প্রতিদিন প্রায় ১৩০টি জাহাজ এই জলপথ ব্যবহার করত।

বেলচার বলেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পর আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন খাতে স্বস্তি ফিরেছিল। কিন্তু নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই আশাবাদ দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে। তার ভাষায়, সহিংসতার ধারাবাহিকতা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জাহাজ পরিচালনা এবং নাবিকদের নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে ইরানের বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের কোনারাক বন্দরে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। স্থানীয় কর্মকর্তাদের দাবি, সেখানে নৌবাহিনীর একটি স্থাপনায় শত্রুপক্ষ হামলা চালিয়েছে।

এছাড়া বন্দর আব্বাসে এক রাতে আটটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে। একই সময়ে সিরিক ও জাস্ক বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার খবরও প্রকাশ করা হয়। আবু মুসা দ্বীপেও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে বলে জানানো হয়েছে। দ্বীপটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বিরোধ রয়েছে।

ইরানি গণমাধ্যম আরও জানিয়েছে, চাবাহার এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা দিয়েছে এবং বুশেহরে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর একটি ব্যারাকে আগুন লেগেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ছবিতে চাবাহারের একটি সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের ক্ষয়ক্ষতির দৃশ্যও দেখা গেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তাদের সাম্প্রতিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল ইরানের এমন সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা, যা বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে। অভিযানে উপকূলীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক রসদ সরবরাহ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলেও দাবি করেছে সংস্থাটি।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে উঠেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে গত মাসে হওয়া যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত শেষ হয়ে গেছে। তিনি আরও মন্তব্য করেন, ভবিষ্যতে নতুন করে আলোচনা চালিয়ে যাওয়াকে তিনি সময়ের অপচয় বলে মনে করেন।

অন্যদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশটির প্রধান প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তারও কঠোর জবাব দেওয়া হবে। তিনি আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালী পরিচালনার বিষয়টি কোনো বিদেশি চাপের মাধ্যমে নয়, বরং ইরানের ব্যবস্থাপনাতেই পরিচালিত হবে।

বিজ্ঞাপন

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, তাদের দেশ কথার বদলে বাস্তব পদক্ষেপের মাধ্যমে জবাব দিতে প্রস্তুত।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৭ জুন দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরও যে মাত্রার সংঘাত দেখা যাচ্ছে, তা সাম্প্রতিক সময়ে নজিরবিহীন। যদিও চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচল এবং নিষেধাজ্ঞা শিথিলসহ একাধিক বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল, তবুও বর্তমান পরিস্থিতি সেই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বর্তমান সংঘাত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপরও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD