একজন ইসরায়েলির বদলে কোটি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা উচিত

অধিকৃত পশ্চিম তীরের একটি ইসরায়েলি বসতি ঘিরে সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে চরমপন্থি এক ইসরায়েলি আইনজীবীর বিতর্কিত মন্তব্য সামনে এসেছে। ইহুদা শিমোন নামের ওই আইনজীবী দাবি করেছেন, একজন ইসরায়েলি নিহত হলে তার প্রতিশোধ হিসেবে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা উচিত।
বিজ্ঞাপন
পশ্চিম তীরের পাহাড়ি এলাকায় ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর কাছাকাছি গড়ে উঠেছে ইসরায়েলি বসতি ‘হাভাত গিলাদ’। গত ৩১ জুলাই তাল নামের একটি গ্রামে ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলিদের সংঘর্ষে হাভাত গিলাদের এক ইসরায়েলি নিরাপত্তারক্ষী নিহত হন। ওই ঘটনায় চার ফিলিস্তিনি ও এক ইসরায়েলি সেনাও নিহত হন। ঘটনার পর আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলার অভিযোগ ওঠে।
পরিস্থিতি ও বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে জানতে হাভাত গিলাদে গিয়ে কথা বলা হয় শিমোনের সঙ্গে। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় অভিযুক্ত ইসরায়েলিদের পক্ষে আইনি সহায়তা দেওয়া এই আইনজীবী সাম্প্রতিক হামলাগুলোকে যৌক্তিক বলে দাবি করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, একজন ইসরায়েলিকে হত্যা করা হলে তাল, সাররা, জিত ও ফারাতার মতো আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামের মানুষদের হত্যা করা উচিত। এরপর তাকে প্রশ্ন করা হয়, একজন ইহুদির জীবনের সঙ্গে কি শত শত বা হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জীবনকে তুলনা করছেন? জবাবে শিমোন আরও চরম বক্তব্য দিয়ে বলেন, একজন ইহুদির জীবন নাকি কোটি ফিলিস্তিনির সমান।
বিজ্ঞাপন
তার এই বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তা প্রত্যাহার করেননি। বরং দাবি করেন, ঈশ্বর ইহুদিদের বেছে নিয়েছেন এবং এ কারণেই অন্যরা তাদের প্রতি ঈর্ষান্বিত।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার পেছনে থাকা চরমপন্থি চিন্তাধারা বোঝার ক্ষেত্রে শিমোনের বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। হাভাত গিলাদের মতো অননুমোদিত বসতিতে থাকা অনেক বসতি স্থাপনকারী পশ্চিম তীরকে ইহুদিদের পবিত্র ভূমি হিসেবে দাবি করেন।
আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিগুলো অবৈধ বলে বিবেচিত। তবে শিমোন আন্তর্জাতিক আইনকে গুরুত্ব না দিয়ে বাইবেলের ভিত্তিতে ওই ভূখণ্ডের ওপর ইহুদিদের অধিকার রয়েছে বলে দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
দুই দশকেরও বেশি আগে ফিলিস্তিনিদের হাতে নিহত এক ইসরায়েলি নিরাপত্তাকর্মীর স্মরণে হাভাত গিলাদ গড়ে তোলা হয়েছিল। সেখানে কয়েকটি বাড়িঘরের পাশাপাশি একটি আঙুর বাগানও রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বসতির প্রবেশপথের কাছে কয়েকটি ভবন পুড়ে যাওয়ার ঘটনা দেখা গেছে। শিমোন এ ঘটনায় ফিলিস্তিনিদের দায়ী করলেও ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আগুনের ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েল সরকার একসময় হাভাত গিলাদকে বৈধতা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে বসতি পর্যবেক্ষণকারী একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বসতিটির বড় অংশ ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমিতে গড়ে উঠেছে। এ কারণে সরাসরি বৈধতা দেওয়ার পরিবর্তে আশপাশের রাষ্ট্রীয় জমিতে নতুন বসতি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
শিমোন শুধু বসতি সম্প্রসারণের পক্ষেই অবস্থান নেননি, তিনি ইসরায়েল সরকার ও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেন। তার দাবি, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট কঠোর নয় এবং সংঘর্ষের সময় ফিলিস্তিনিদের হত্যা না করে তাদের আলাদা করে দেওয়া হয়।
তবে পশ্চিম তীরের হতাহতের পরিসংখ্যান তার দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের (ওসিএইচএ) হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত পশ্চিম তীরে ৬৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। একই সময়ে একজন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন।
এ ছাড়া চলতি বছর বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ফিলিস্তিনিদের আহত হওয়ার হারও বেড়েছে। প্রতিদিন গড়ে তিনজনের বেশি ফিলিস্তিনি এ ধরনের হামলায় আহত হয়েছেন বলে ওই পরিসংখ্যানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পশ্চিম তীরে দায়িত্ব পালন করা এক ইসরায়েলি সেনার বক্তব্যও তুলে ধরা হয়েছে। তার ভাষ্য, তিনি নিয়মিত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আতঙ্ক দেখেছেন, কিন্তু ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে একই ধরনের ভয় দেখেননি।
এ বিষয়ে শিমোনের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের বক্তব্য প্রচারের অভিযোগ তোলেন। তার দাবি, ফিলিস্তিনিরা ভবিষ্যতে বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের ওই এলাকা, ইসরায়েল ও গাজা থেকে সরিয়ে না দিলে তারা বারবার ফিরে আসবে।
পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি নিয়ে শিমোন আরও বলেন, ফিলিস্তিনিদের সামনে তিনটি পথ রয়েছে—ইসরায়েলি শাসন মেনে নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে থাকা, অন্য কোনো আরব বা মুসলিম দেশে চলে যাওয়া অথবা ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিতে না থাকলে তাদের হত্যা করা।
বিজ্ঞাপন
তার এই বক্তব্যের সঙ্গে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোৎরিচের অতীতের একটি পরিকল্পনার মিল রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। স্মোৎরিচও এর আগে ফিলিস্তিনিদের ইসরায়েলি শাসন মেনে নেওয়া, অন্যত্র চলে যাওয়া কিংবা সশস্ত্র প্রতিরোধ করলে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হওয়ার মতো বিকল্পের কথা বলেছিলেন।
সম্প্রতি স্মোৎরিচ গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় স্থানান্তর’ এবং সেখানে পুনরায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনি জাতীয় পরিচয় নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন।
হাভাত গিলাদের কাছাকাছি বসবাসকারী ফিলিস্তিনিরা অবশ্য নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, বসতি স্থাপনকারীদের আকস্মিক হামলার আশঙ্কায় তারা সবসময় আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। ইসরায়েলি সেনারা বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা দিলেও ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষিত থাকে বলেও অভিযোগ তাদের।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এক ফিলিস্তিনি বাসিন্দা হতাশা প্রকাশ করে বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ এখন বিভিন্ন সংঘাত ও নিজস্ব সমস্যায় ব্যস্ত। ফলে পশ্চিম তীরের ফিলিস্তিনিরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
হাভাত গিলাদ থেকে আশপাশের ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোর দূরত্ব এক মাইলেরও কম। কিন্তু ইসরায়েলি বসতি, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, আইনগত বিরোধ ও দীর্ঘদিনের সংঘাতের কারণে এলাকাটি বর্তমানে গভীর বিভাজন ও সহিংসতার মধ্যে রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি








