যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি এড়িয়ে ৯ বিলিয়ন ডলার সরিয়েছে ইরান

আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার মধ্যেই ২০২৪ সালে ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৯০০ কোটি ডলার মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। এক তদন্তে উঠে এসেছে, বিদেশি ব্যাংকের মধ্যস্থতায় পরোক্ষভাবে বিপুল এই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকিং নেটওয়ার্কে প্রবেশ করেছে।
বিজ্ঞাপন
তদন্তের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ দেশটির ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে স্থানান্তরিত প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল শনাক্ত করে। বিদেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শেল কোম্পানি এবং মুদ্রা বিনিময় কেন্দ্রের বিভিন্ন স্তর ব্যবহার করে অর্থ স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
ইরানের অর্থপ্রবাহের এই তথ্য এমন সময়ে প্রকাশ্যে এলো, যখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর করেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ইরানের সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত দেশ বা প্রতিষ্ঠানকে মার্কিন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হতে পারে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে ইরান বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস তেল। যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে রপ্তানি সীমিত হলেও বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এখনও ট্যাংকারে মজুত রয়েছে। এর বড় অংশ এশিয়ার জলসীমায়, বিশেষ করে মালয়েশিয়ার আশপাশে সংরক্ষিত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা বর্তমানে চীন। দেশটি ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি গ্রহণ করে। জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে চীন প্রতিদিন পাঁচ লাখ ব্যারেলের বেশি ইরানি তেল আমদানি করেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নিষেধাজ্ঞা এড়াতে তেলের উৎস গোপন করার কৌশলও ব্যবহার করছে ইরান। সমুদ্রে এক ট্যাংকার থেকে অন্য ট্যাংকারে তেল স্থানান্তর করে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা জাহাজের পণ্যকে অন্য উৎসের তেল হিসেবে দেখানো হয়। পরে চীনে পৌঁছানোর পর সেই তেল ভিন্ন কোনো দেশের উৎস হিসেবে নথিভুক্ত করা সম্ভব হয়।
জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ভরটেক্সার হিসাব বলছে, এশিয়ার জলসীমায় ভাসমান সংরক্ষণাগার হিসেবে ব্যবহৃত ট্যাংকারগুলোতে বর্তমানে প্রায় ৮ কোটি ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। এসব তেলের সম্ভাব্য বাজারমূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলার।
বিজ্ঞাপন
চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরশীলতাও কমিয়েছে তেহরান। অনেক ক্ষেত্রে চীনা ক্রেতাদের সঙ্গে তেল বাণিজ্যের অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে ইউয়ানে। সেই অর্থ দিয়ে ইরান চীন থেকে পণ্য ও সেবা কিনছে। কোথাও কোথাও অবকাঠামো নির্মাণের মতো প্রকল্পের বিনিময়েও তেল সরবরাহ করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহারও বাড়িয়েছে ইরান। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্য পরিচালনা এবং অস্ত্রসহ বিভিন্ন পণ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে দেশটি বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করেছে। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) চীনা ক্রেতাদের কাছ থেকে তেলের মূল্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করেছে।
তবে আমদানি ব্যয়, সামরিক সরঞ্জাম কেনা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তার জন্য ইরানের এখনও মার্কিন ডলারসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য মুদ্রার প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণে হংকং ও দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে শেল কোম্পানি এবং মানি এক্সচেঞ্জের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তেল রপ্তানি ও অন্যান্য বাণিজ্য থেকে পাওয়া অর্থ ডলার, ইউরো এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দিরহামে রূপান্তর করা হয়। একই সঙ্গে অর্থের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়।
ইরানের অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যাচ্ছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক বা কোম্পানির বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থা নিলেও পুরো আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ককে অচল করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল








