Logo

হাসিনার প্রত্যর্পণে নীরব দিল্লি, তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৬:৩৮
হাসিনার প্রত্যর্পণে নীরব দিল্লি, তারেক রহমানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা
ছবি: সংগৃহীত

শেখ হাসিনাকে ঘিরে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের টানাপোড়েন এখনো পুরোপুরি কাটেনি। বাংলাদেশ বারবার ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানালেও এ বিষয়ে নয়াদিল্লি এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি। তবে একই সময়ে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার বার্তা দিচ্ছে ভারত।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ এবং পারস্পরিক স্বার্থের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে নয়াদিল্লি। তবে শেখ হাসিনাকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা শেখ হাসিনার

শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কী প্রক্রিয়ায় তিনি দেশে ফিরবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে সম্প্রতি দিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে সরাসরি বক্তব্য দেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। বিশেষ করে বাংলাদেশে দণ্ডিত শেখ হাসিনা কীভাবে ভারতের মাটিতে অবস্থান করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে ঢাকা।

প্রত্যর্পণ নিয়ে এখনো স্পষ্ট নয় ভারতের অবস্থান

শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়া বর্তমানে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভারতের কাছে তার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি নয়াদিল্লি। ভারতের বক্তব্য, বাংলাদেশের পাঠানো প্রত্যর্পণ অনুরোধ আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

ফলে ঢাকার পক্ষ থেকে একাধিকবার দাবি জানানো হলেও প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারতের অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়। কূটনৈতিক পর্যায়ে এই বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলছে।

দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষোভ

বিজ্ঞাপন

দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে। ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়, পলাতক ও দণ্ডিত শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে সরাসরি গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া উদ্বেগজনক।

বাংলাদেশের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের ঘটনা দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের চলমান প্রচেষ্টাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। তবে ভারত জানিয়েছে, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দেশটির সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানিয়েছেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনার অনুষ্ঠানটি একটি বেসরকারি সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত হয়েছিল। এতে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা সেখানে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সঙ্গেও ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানায় নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে তার বক্তব্যকে ভারত সরকার সমর্থন করে না বলেও স্পষ্ট করা হয়।

বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় নয়াদিল্লি

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনা ইস্যুতে অস্বস্তি থাকলেও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা দিয়ে যাচ্ছে ভারত।

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে হলে উভয় পক্ষকে অভিন্ন জায়গা ও পারস্পরিক স্বার্থ খুঁজে বের করতে হবে।

তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট মন্তব্য করেননি। ফলে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে ভারতের আগ্রহ প্রকাশ পেলেও প্রত্যর্পণ ইস্যুতে দেশটির অবস্থান অপরিবর্তিতভাবে অস্পষ্ট রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর

দুই দেশের সম্পর্কের আলোচনায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও গুরুত্ব পাচ্ছে। ভারত এরই মধ্যে তাকে দুইবার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তবে সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

শেখ হাসিনা ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তি চলার মধ্যেই তারেক রহমানের সম্ভাব্য সফরকে সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়াতে নয়াদিল্লির আগ্রহের বিষয়টিও এতে স্পষ্ট হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে শ্রিংলার ব্যাখ্যা

ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলাও শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।

৯ সেপ্টেম্বর বারাসতের আদামাস বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা কী বলছেন, সেটি তার নিজের বিষয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে তার বিষয়। ভারত সরকার এরই মধ্যে একাধিকবার স্পষ্ট করেছে যে শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।

বিজ্ঞাপন

শ্রিংলা বলেন, ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে এবং পারস্পরিক স্বার্থে উভয় দেশকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।

ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের আমন্ত্রণ

বাংলাদেশকে ব্রিকস সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টিও তুলে ধরেন শ্রিংলা। তিনি বলেন, ভারত ঘনিষ্ঠ অংশীদার দেশগুলোকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশকেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আয়োজনের ক্ষেত্রে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

শ্রিংলার মতে, ব্রিকসের মতো বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ হলে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে বাংলাদেশের নেতৃত্বের যোগাযোগ ও বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দিল্লিতে সেমিনার বাতিল

শেখ হাসিনার বক্তব্যকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই দিল্লিতে আরেকটি ঘটনা আলোচনায় আসে। নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব একটি সেমিনার আয়োজনের পরিকল্পনা করেছিল, যেখানে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার অংশ নেওয়ার কথা ছিল।

তবে শেষ মুহূর্তে দিল্লি পুলিশ অনুমতি না দেওয়ায় অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হয়। ২৯ আগস্ট ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব এক বিবৃতিতে বিষয়টি জানায়।

এই ঘটনাও দিল্লিতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।

সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জলবায়ু ও পরিবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রেও সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য না করার অবস্থানও জানান তিনি। তার বক্তব্য, বাংলাদেশের মানুষ এবং নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারই দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জানে।

তারেক রহমানকে অভ্যর্থনার বার্তা

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়েও ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন দীনেশ ত্রিবেদী।

তিনি বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে তারেক রহমান ভারত সফর করলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় অভ্যর্থনা দেওয়া হবে। তার সফরের জন্য ভারত আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছে বলেও জানান তিনি।

তারেক রহমানের সফর দুই দেশের জনগণের জন্য ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে বড় প্রশ্ন শেখ হাসিনা

সব মিলিয়ে শেখ হাসিনাকে ঘিরে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের অস্বস্তি এখনো কাটেনি। বাংলাদেশ তাকে ফেরত দেওয়ার দাবি অব্যাহত রাখলেও প্রত্যর্পণের বিষয়ে ভারত এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি।

অন্যদিকে নয়াদিল্লির কর্মকর্তারা বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন, পারস্পরিক স্বার্থে সহযোগিতা এবং দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছেন।

তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর, ব্রিকসের আমন্ত্রণ, সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো সামনে রেখে দুই দেশের সম্পর্কের নতুন ভিত্তি তৈরির চেষ্টা চলছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

তবে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্ক কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে, তার অন্যতম বড় প্রশ্ন এখনো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যু। একদিকে সম্পর্ক উন্নয়নের বার্তা, অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে কূটনৈতিক অস্বস্তি—এই দুই বাস্তবতার মধ্য দিয়েই এগোচ্ছে দুই দেশের সম্পর্ক।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD