‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে শাস্তি দেয়া যাবে না: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট

বিবেক বা ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেউ জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা উচিত নয়—এমন মৌখিক পর্যবেক্ষণ দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) একটি মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ বিষয়ে তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে। আদালত জানায়, কোনো ব্যক্তি ‘বন্দে মাতরম’-এর পুরোটা না গাইলেই তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত রায় নয়; বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছে আদালত।
বিজ্ঞাপন
‘বন্দে মাতরম’-এ মোট ছয়টি স্তবক রয়েছে। তবে স্বাধীনতার আগে থেকেই বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সাধারণত প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়ার প্রচলন রয়েছে। এর পেছনে ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট রয়েছে। গানটির পরবর্তী স্তবকগুলোতে হিন্দু দেবী দুর্গা, কালী, লক্ষ্মী ও সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে। এ কারণে তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কয়েকজন মুসলিম নেতা পুরো গান গাওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
১৯৩৭ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনের আগে গানটি নিয়ে বিতর্কের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মৌলানা আজাদ ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতামত জানতে চেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার পরামর্শ দেন। এরপর থেকেই কংগ্রেসের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার রীতি অনুসরণ করা হয়ে আসছে।
এদিকে ‘বন্দে মাতরম’-এর দেড়শ বছর পূর্তি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইনে সংশোধন এনে জাতীয় সংগীতের পাশাপাশি জাতীয় গানকেও আইনি সুরক্ষার আওতায় এনেছে। সংশোধিত বিধানে কেউ যদি ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ায় ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দেন অথবা গান পরিবেশনের সময় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন, তাহলে সেটি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ ধরনের অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা অথবা একই সঙ্গে উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই সংশোধিত আইনের সাংবিধানিক বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে একাধিক আবেদন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কর্ণাটকের বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণও এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে একটি রিট আবেদন করেছেন। তাঁর আবেদনে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা এবং সংশোধিত আইনের শাস্তির বিধানকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সেই আবেদনের শুনানিতেই প্রধান বিচারপতির বেঞ্চের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ সামনে আসে।
শুনানিতে বিচারপতিরা বলেন, ‘জাতীয় গান’-এর পরিধি বা সংজ্ঞা নির্ধারণ করা আদালতের কাজ নয়। কোন গান বা গানের কতটি স্তবক জাতীয় গানের অংশ হিসেবে থাকবে, সেটি নির্ধারণের বিষয়টি সরকারের এখতিয়ার ও নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত। তবে কোনো নাগরিক ধর্মীয় বিশ্বাস বা নিজের বিবেকের কারণে গানটি গাইতে না চাইলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না, সেই বিষয়টি আদালত সাংবিধানিক অধিকারের আলোকে পরীক্ষা করতে পারে।
শুনানির সময় বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ১৯৮৬ সালের বিজোই ইমানুয়েল মামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ওই মামলায় ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কেরালার একটি স্কুলে জাতীয় সংগীত গাইতে অস্বীকৃতি জানানো তিন শিক্ষার্থীকে সুপ্রিম কোর্ট সুরক্ষা দিয়েছিল। আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, জাতীয় সংগীতের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের জন্য যে শাস্তির বিধান রয়েছে, শুধু জাতীয় সংগীত না গাওয়ার কারণে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করা যায় না।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবারের শুনানিতে আদালত সেই পুরোনো রায়ের নীতির সঙ্গে বর্তমান ‘বন্দে মাতরম’ মামলার সম্পর্কও বিবেচনায় নেয়। আদালত কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য জানতে চেয়েছে এবং দুই সপ্তাহের মধ্যে জবাব জমা দিতে বলেছে। তবে এ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়া হয়নি।
শুনানিকে কেন্দ্র করে আদালতে আবেদনকারীর আইনজীবী এস মুরলীধর এবং সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতার মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডাও হয়। মুরলীধর যুক্তি দেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর শেষ চারটি স্তবকে হিন্দু দেবীদের উল্লেখ রয়েছে। ফলে সব নাগরিককে পুরো গান গাইতে বাধ্য করা হলে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কোনো জাতীয় ঐকমত্য ছাড়াই সংশোধনী দ্রুত কার্যকর করা হয়েছে। জবাবে তুষার মেহতা বলেন, সংবিধানের বিধান অনুসরণ করেই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং আইন তৈরির ক্ষেত্রে নকশালপন্থীদের দাবি অনুসরণ করা হয়নি। মুরলীধর এর প্রতিবাদ করে বলেন, স্বাধীনচেতা বা ভিন্নমত পোষণকারী মানুষকে নকশালপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।
বিজ্ঞাপন
এই বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে বিচারপতিরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করেননি। তবে তারা জানিয়ে দেন, ওই ধরনের মন্তব্য আদালতের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে না। শুনানির মূল বিষয় হিসেবে নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা, বিবেকের অধিকার এবং সংশোধিত আইনের শাস্তির বিধানই গুরুত্ব পায়।
কেন্দ্রীয় সরকারের নতুন বিধান কার্যকর হওয়ার পরও কংগ্রেসের বিভিন্ন দলীয় অনুষ্ঠানে পুরো ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার পরিবর্তে প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার রীতি দেখা গেছে। ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক প্রথার কথা উল্লেখ করে কংগ্রেসের নেতারা এ অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দিয়েছেন।
সম্প্রতি কর্ণাটক বিধানসভা ও বিধান পরিষদের অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক দেখা যায়। সেখানে শাসক দল কংগ্রেসের বিধায়কেরা ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবক গেয়ে থেমে যান। অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা প্রতিবাদ হিসেবে পুরো গানটি গান। এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তীব্র হয়।
বিজ্ঞাপন
কংগ্রেসের নেতারা কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানকে প্রশ্ন করে বলেন, যদি প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার ঐতিহাসিক রীতিকে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সেই প্রথার সঙ্গে যুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জওহরলাল নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসু ও সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।
এদিকে জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ ‘বন্দে মাতরম’ ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থানের সঙ্গে একমত হননি। সরকারি অনুষ্ঠানে পুরো গান গাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে যে আইন কার্যকর রয়েছে, সরকারকে সেটি মেনে চলতে হবে। কংগ্রেস যদি এই বিধান পরিবর্তন করতে চায়, তাহলে ক্ষমতায় এসে আইন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে পারে।
ওমর আবদুল্লাহর বক্তব্যের পেছনে সাম্প্রতিক একটি সরকারি অনুষ্ঠানের ঘটনাও রয়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণ সংস্করণ পরিবেশিত হলে মুখ্যমন্ত্রী ওমর আবদুল্লাহ এবং সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ পুরো গান চলাকালে দাঁড়িয়ে ছিলেন। পরে এ নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য প্রকাশ্যে আসে।
বিজ্ঞাপন
কংগ্রেসের সমালোচনার জবাবে ওমর আবদুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, আইন কার্যকর থাকা অবস্থায় সরকারি অনুষ্ঠানে সেটি পালন না করলে এর আইনি পরিণতি কী হবে। তিনি বলেন, তিনি চান না এই বিষয়কে কেন্দ্র করে কাশ্মীরিদের কারাগারে যেতে হোক। তাঁর বক্তব্য ছিল, আইন নিয়ে আপত্তি থাকলে সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেটি পরিবর্তন করা উচিত।
সব মিলিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিতর্ক এখন একই সঙ্গে আইনি, সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে কেন্দ্রীয় সরকারের সংশোধিত আইনে জাতীয় গানকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্ট ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের কারণে গান না গাওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্নটি পরীক্ষা করছে।
তবে মঙ্গলবারের শুনানিতে সুপ্রিম কোর্ট যে বক্তব্য দিয়েছে, সেটিকে চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কেন্দ্রীয় সরকারের জবাব পাওয়ার পর মামলাটির পরবর্তী শুনানিতে আদালত এ বিষয়ে আরও স্পষ্ট অবস্থান জানাতে পারে।








