Logo

গাজায় ধ্বংসস্তূপের পাহাড়, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১০:৩৪
গাজায় ধ্বংসস্তূপের পাহাড়, নিচে চাপা পড়ে আছে ১০ হাজার মরদেহ
ছবি: সংগৃহীত

গাজা উপত্যকাজুড়ে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টনে। জাতিসংঘের হিসাবে, এসব ধ্বংসাবশেষ সরাতে অন্তত সাত থেকে ১০ বছর সময় লাগতে পারে এবং ব্যয় হতে পারে শত শত কোটি ডলার। একই সঙ্গে ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

গাজা সিটির তেল আল-হাওয়া এলাকার বৈরুত স্ট্রিট এরই একটি উদাহরণ। একসময় দোকানপাট, অফিস ও মানুষের ব্যস্ততায় সরগরম থাকা সড়কটি এখন প্রায় জনশূন্য। রাস্তার পাশে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বহুতল ভবন কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটির ভেতরেই ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েকটি বাস্তুচ্যুত পরিবার। ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে কোথাও কোথাও রাস্তার ওপর দিয়ে নোংরা পানি প্রবাহিত হচ্ছে।

তীব্র গরমের মধ্যে সারাদিন কাজ করে বৈরুত স্ট্রিটের একটি অংশ পরিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী আহমেদ আলিয়ান। দিনের কাজ শেষে চারপাশের ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, ‘মনে হচ্ছে আমরা হাতে একটা চামচ নিয়ে পুরো সমুদ্র সেঁচে ফেলার চেষ্টা করছি।’

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স জানিয়েছেন, গাজায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ প্রায় ৬ কোটি ১০ লাখ টন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১৮ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধে যে পরিমাণ ধ্বংসস্তূপ তৈরি হয়েছে, গাজার পরিমাণ তার প্রায় ২০ গুণ। এই বিপুল ধ্বংসাবশেষ অপসারণ আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার অভিযান হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

গত দুই বছরের বেশি সময়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজার প্রায় ৫৮০ কিলোমিটার সড়ক পরিষ্কার করেছে। এর ফলে ত্রাণবাহী ট্রাক, উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় মানুষের চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৯ লাখ ৭ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে এবং ৩ লাখ টনের বেশি পুনর্ব্যবহার বা পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা হয়েছে। কিন্তু এই পরিমাণ গাজার মোট ধ্বংসস্তূপের মাত্র প্রায় দেড় শতাংশ।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের সংকট। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য ও ওষুধের বাইরে অনেক সরঞ্জামকে ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ সামগ্রী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ফলে ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী গাজায় প্রবেশে বিধিনিষেধ রয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হামলা ও নতুন করে ধ্বংসের ঘটনা ঘটায় কিছু সড়ক একাধিকবার পরিষ্কার করতে হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির সময় নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে প্রবেশাধিকারও সীমিত রয়েছে। গাজার মাত্র প্রায় ৩০ শতাংশ এলাকায় মানুষ ও ত্রাণকর্মীদের প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে বলে দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

নতুন যন্ত্রপাতি ও নির্মাণসামগ্রী না পাওয়ায় ধ্বংসস্তূপ পুনর্ব্যবহারের দিকে ঝুঁকেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি। গাজাজুড়ে পাঁচটি ধ্বংসস্তূপ ভাঙার কেন্দ্র পরিচালনা করছে সংস্থাটি। সেখানে যুদ্ধের আগেই গাজায় থাকা সাতটি পুরোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি স্থানীয় প্রকৌশলীরা মেরামত করে আবার সচল করেছেন। প্রথমে ধ্বংসস্তূপ থেকে লোহা ও রড আলাদা করা হয়। পরে কংক্রিট ভেঙে ছোট টুকরোয় পরিণত করা হয়।

তবে পুরোনো যন্ত্রপাতি সচল রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ। খুচরা যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিনের তেলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকটে মেশিনগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। ফলে সীমিত সক্ষমতা নিয়েই চলছে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কারের কাজ।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রকৌশলী নেহাল আবু হাসান জানান, প্রাকৃতিক নির্মাণসামগ্রীর তুলনায় পুনর্ব্যবহৃত ভাঙা কংক্রিটের মান কম এবং এগুলো দিয়ে কাজ করাও কঠিন। তবে পরিস্থিতির কারণে তাদের সামনে অন্য কোনো বিকল্প নেই। এসব কংক্রিটের টুকরো দিয়ে রাস্তা মেরামত ও গর্ত ভরাট করা হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়ের নিচে এগুলো বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যাতে বৃষ্টির পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনের বর্জ্য থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাওয়া যায়।

ধ্বংসস্তূপ সরানোর সুফলও কিছুটা পাচ্ছেন স্থানীয়রা। জাবালিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে তেল আল-হাওয়ায় আশ্রয় নেওয়া ইব্রাহিম দারাদোনা জানান, ধ্বংসাবশেষ সরানোর পর পোকামাকড় ও ইঁদুরের উপদ্রব কমেছে, গাড়ি চলাচল সহজ হয়েছে এবং শিশুদের খেলার জায়গাও কিছুটা নিরাপদ হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত দোকানের সামনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর পর প্রায় ২০ দিনের মধ্যেই কিছু ছোট ব্যবসায়ী আবার দোকান খুলতে শুরু করেছেন।

তবে গাজার মানুষের কাছে এসব ধ্বংসস্তূপ শুধু ইট-পাথর বা কংক্রিটের স্তূপ নয়। এর নিচে চাপা পড়ে আছে তাদের ঘরবাড়ি, স্মৃতি এবং প্রিয়জনের মরদেহ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির হিসাবে, এখনো ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকতে পারে। ফলে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের বিষয়টি পরিবারগুলোর জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল।

বিজ্ঞাপন

মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি পরিচয় শনাক্তকরণ ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফনের কাজেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে মানবদেহের অবস্থান শনাক্ত, ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত এবং পরিবারগুলোর প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেওয়ার প্রক্রিয়ায় কাজ করছে।

ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা অবিস্ফোরিত বোমাও উদ্ধারকাজের জন্য বড় ঝুঁকি। এর পাশাপাশি অ্যাসবেস্টসসহ ক্ষতিকর উপাদান এবং আংশিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকা দুর্বল ভবনও বিপদের কারণ হয়ে আছে। জাতিসংঘের মাইন অ্যাকশন সার্ভিস, ব্রিটিশ সংস্থা হ্যালো ট্রাস্ট এবং অন্যান্য অংশীদার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত ও চিহ্নিত করার কাজে সহায়তা করছে। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি ধীরগতিতে এগোচ্ছে।

জাতিসংঘের হিসাবে, গাজার এই বিপুল ধ্বংসস্তূপ সরানো শুধু পুনর্গঠনের পূর্বশর্ত নয়; একই সঙ্গে এর নিচে থাকা মরদেহ উদ্ধার, অবিস্ফোরিত অস্ত্রের ঝুঁকি কমানো এবং মানুষের চলাচল ও মৌলিক সেবা পুনরায় চালুর সঙ্গেও বিষয়টি সরাসরি যুক্ত।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD