Logo

প্রথম স্বামী-সন্তানদের পর দ্বিতীয় স্বামীকেও হারালেন নিসরিন

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২১:১০
প্রথম স্বামী-সন্তানদের পর দ্বিতীয় স্বামীকেও হারালেন নিসরিন
ছবি: সংগৃহীত

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি হামলায় ৩৪ বছর বয়সী নিসরিন তোওমান হারিয়েছেন দুই স্বামী ও দুই সন্তানকে। এক হামলায় প্রথম স্বামী ও দুই সন্তানকে হারানোর পর ফের বিয়ে করেছিলেন তিনি। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ের মাত্র আট মাস পর সেই স্বামীকেও ইসরায়েলি হামলায় হারান নিসরিন। বর্তমানে ছোট মেয়ে সিদরাকে নিয়ে একাই বসবাস করছেন তিনি। খবর আলজাজিরার।

বিজ্ঞাপন

গাজায় ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর পর ২০২৪ সালের জুনে ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় নিহত হন নিসরিনের প্রথম স্বামী সামি এবং তাদের দুই সন্তান মাহমুদ ও লাইথ। ওই এক হামলাতেই নিজের পরিবার ও জীবনের সবকিছু হারান তিনি।

মধ্য গাজার নুসেইরাতে তাদের বাড়ি ছিল। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে সেখানেই সুখের সংসার ছিল নিসরিনের। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ৮ জুন পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে নুসেইরাতের বাড়িতে ফিরেছিলেন তারা।

নিসরিন বলেন, বাড়িতে ফেরার পর তার সন্তানরা রাস্তায় খেলতে যায়। কিছুক্ষণ পর তারা তীব্র বোমা ও গুলির শব্দ শুনতে পান। তার স্বামী তখন শিশুদের বাড়িতে নিয়ে আসতে বাইরে যান। নিজের, ভাই ও বোনের সন্তানদের নিয়ে আসার পর বাইরে কী ঘটছে তা দেখতে আবার বের হন তিনি। সেটিই ছিল স্বামীকে শেষবার দেখার ঘটনা।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরে নিসরিন জানতে পারেন, ইসরায়েলি একটি কোয়াডকপ্টার থেকে গুলি করে তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে।

এর কয়েক মিনিট পর তাদের বাড়িতেও সরাসরি হামলা হয়। এতে কিছু সময়ের জন্য জ্ঞান হারান নিসরিন। জ্ঞান ফেরার পর সন্তানদের খুঁজতে গিয়ে দেখেন, তার দুই সন্তানই নিথর হয়ে পড়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, চারপাশে তখন শুধু রক্ত ও শরীরের খণ্ডাংশ দেখতে পাচ্ছিলেন। প্রায় দুই ঘণ্টা নিজের দুই মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে বসেছিলেন তিনি। পরে রেডক্রসের সহায়তায় পুরো পরিবারকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

ওই হামলায় নিসরিনের পরিবারের ১৮ জন সদস্য নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তার আপন বোনও ছিলেন। তার বোনের স্বামীও ওই হামলায় স্ত্রীকে হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে একা হয়ে পড়েন।

দেবরকে বিয়ে করেন নিসরিন

বিজ্ঞাপন

বোনের মৃত্যুর পর তার চার সন্তানও মাতৃহারা হয়ে পড়ে। এর মধ্যে স্ত্রীহারা দেবর নিসরিনকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। শুরুতে তিনি এতে রাজি ছিলেন না। আবার বিয়ে করে নতুন সংসার করার ইচ্ছাও ছিল না তার।

তবে বোনের চার এতিম সন্তানের কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত দেবরকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন নিসরিন।

তিনি বলেন, বিয়ের প্রস্তাব পাওয়ার পর প্রথমে তিনি তীব্রভাবে বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু বোনের চার সন্তানের কথা, বিশেষ করে এক বছর বয়সী শিশুটির কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত রাজি হন।

বিজ্ঞাপন

প্রথমে দ্বিতীয় সংসারে আর সন্তান নিতে চাননি নিসরিন। কিন্তু মায়ের পরামর্শে আবারও মাতৃত্বের স্বাদ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

নিসরিন জানান, তার মৃত দুই সন্তানকে প্রতিদিন স্বপ্নে দেখতেন। তারা কোনোভাবেই তার মন থেকে দূরে যাচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে মায়ের কথায় আবারও সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।

দ্বিতীয় স্বামীকেও হারালেন

বিজ্ঞাপন

কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ের মাত্র আট মাসের মাথায় আবারও নেমে আসে শোক। ২০২৫ সালের ৮ জুলাই দ্বিতীয় স্বামী মোহাম্মদও ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।

নিসরিন জানান, ওইদিন সকালে মোহাম্মদ ঘুম থেকে উঠে শিশুদের সঙ্গে নাশতা করেন। পরে এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন। কিছুক্ষণ পরই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান তিনি।

পরে এক প্রতিবেশী এসে জানান, নুসেইরাতের আল-আওদা হাসপাতালের কাছে কয়েকজনের ওপর ইসরায়েলি হামলা হয়েছে। এতে অনেক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে মোহাম্মদও ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর নিসরিনের মনে হয়, তার জীবন আবারও শূন্য হয়ে গেছে।

তবে স্বামীকে হারানোর চার মাস পর সন্তানের জন্ম দেন তিনি। মেয়েটির নাম রাখেন সিদরা।

বর্তমানে ছোট মেয়ে সিদরাকে নিয়ে একাই থাকেন নিসরিন। অন্যদিকে তার বোন ও দ্বিতীয় স্বামীর চার সন্তান তাদের দাদার সঙ্গে থাকে। সুযোগ পেলেই তিনি তাদের দেখতে যান।

বিজ্ঞাপন

জীবনে বারবার স্বজন হারানোর পরও নিসরিন এখন মেয়েকে নিয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছেন। গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে তার জীবনের এই গল্প পরিবার হারানো অসংখ্য মানুষের মতোই এক নির্মম বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরছে।

সূত্র: আলজাজিরা

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD