Logo

দরিদ্র বাড়িয়ে দারিদ্র্যের জাদুকরের বিদায়

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৩:৪৯
দরিদ্র বাড়িয়ে দারিদ্র্যের জাদুকরের বিদায়
ছবি: সংগৃহীত

শান্তিতে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস দীর্ঘদিন ধরে ‘দারিদ্র্যকে জাদুঘরে পাঠানো’র দর্শন তুলে ধরেছেন বিশ্বমঞ্চে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ১৮ মাস দায়িত্ব পালন শেষে বিদায়ের প্রাক্কালে দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা সেই দর্শনের বিপরীত চিত্রই সামনে এনেছে—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাপক সমর্থন নিয়ে দায়িত্ব নিলেও তাঁর আমলে নতুন করে প্রায় ৩০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন বলে বিভিন্ন পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা কার্যকরভাবে কাজে লাগানো যায়নি। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি সরকার পক্ষ থেকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও সমালোচকদের অভিযোগ—এটি অর্জিত হয়েছে আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও অভ্যন্তরীণ ব্যয় সংকোচনের মাধ্যমে, যার চাপ পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর।

বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিতে নিম্নমুখী ধারা:

বিজ্ঞাপন

অধ্যাপক আব্দুল বায়েসসহ একাধিক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, একজন অর্থনীতিবিদের নেতৃত্বে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে—এমন প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়িক আস্থায় বড় ধস নেমেছে এবং শিল্প উৎপাদনও দুর্বল হয়েছে। তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ২৪ শতাংশ; এক বছর পর ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে—যা চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের হারও গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা রেখে গেছে বিদায়ী প্রশাসন, যা সামনের সময়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ব্যাংক খাতে সংকট ও মূল্যস্ফীতির চাপ:

বিজ্ঞাপন

ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়ে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকায়, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, এই হার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল সাড়ে ৮ শতাংশের কাছাকাছি, যেখানে মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ১ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ আয় বৃদ্ধির তুলনায় ব্যয় বেড়েছে দ্রুততর গতিতে। এ পরিস্থিতিতে ৩৪ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভের পরিসংখ্যান স্বস্তি দিলেও তা কতটা টেকসই—সে প্রশ্ন তুলেছেন গবেষকরা।

বিজ্ঞাপন

স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে সুবিধা?

সমালোচকদের অভিযোগ, দায়িত্বে থাকাকালে নিজের সংশ্লিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিগত সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ ব্যাংক-এর কর মওকুফ ও সরকারি শেয়ার ২৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা। পাশাপাশি গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি-র অনুমোদন, গ্রামীণ এমপ্লয়মেন্ট সার্ভিস-এর জনশক্তি রপ্তানির লাইসেন্স এবং গ্রামীণ টেলিকম-এর ডিজিটাল ওয়ালেট চালুর অনুমতি দ্রুত দেওয়া হয়।

এ ছাড়া শ্রম আইন লঙ্ঘন ও অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে সরাসরি সংবাদ সম্মেলনে না আসাও স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক উদ্বেগ:

তাঁর আমলে বিভিন্ন স্থানে গণমাধ্যম কার্যালয়ে হামলা, সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করা এবং ভিন্নমতের কারণে গ্রেপ্তারের ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচিত হয়েছে। মাজার, মন্দির ও অন্যান্য ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা এবং ধর্মীয় উসকানিতে সহিংসতার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ঐতিহাসিক স্থাপনা ও মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত নথি-ভাস্কর্য নষ্ট হওয়ার ঘটনাতেও রাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাপী প্রচারিত তাঁর ‘তিন শূন্য’—শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ—তত্ত্ব বাস্তব প্রয়োগে প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি বলে মত সচেতন মহলের। বরং দারিদ্র্য ও বেকারত্ব বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পরিসরে এই তত্ত্বের নৈতিক অবস্থান কতটা টেকসই থাকবে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিদায়ের প্রাক্কালে ১৮ মাসের এই অধ্যায়কে অনেকেই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ, ঋণের চাপ ও অপূর্ণ সংস্কারের এক বিতর্কিত সময়কাল হিসেবে দেখছেন।

জেবি/জেএইচআর
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD