ঈদযাত্রায় উত্তরের পথে ভোগান্তির নাম ‘এলেঙ্গা-যমুনা সেতু সড়ক’

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গগামী মানুষের যাত্রা স্বস্তিদায়ক হবে কি না—তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঢাকা–টাঙ্গাইল–যমুনা সেতু মহাসড়কের এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার অংশে এখনো উন্নয়ন কাজ চলমান থাকায় চালক ও যাত্রীদের মধ্যে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর মধ্যে অন্যতম এই ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক। রাজধানীর সঙ্গে উত্তরবঙ্গের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হওয়ায় প্রতিদিনই এ পথে বিপুল সংখ্যক যানবাহন চলাচল করে। টাঙ্গাইল জেলার অংশে এই মহাসড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। বিশেষ করে ঈদকে ঘিরে এই সড়ক দিয়ে লাখো মানুষ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করেন। ফলে অন্য সময়ের তুলনায় যানবাহনের চাপ কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং প্রায়ই সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
এ মহাসড়ক দিয়ে উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের মোট ২৩টি জেলার যানবাহন চলাচল করে। চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত অংশে চার লেন থাকলেও এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়কটি এখনো পুরোপুরি সম্প্রসারণ করা হয়নি। ফলে সাড়ে ১৩ কিলোমিটারের এই অংশটিই প্রায় প্রতি ঈদে যানজটের প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়ক উন্নয়ন কাজ সাউথ এশিয়া সাব-রিজিওনাল ইকোনমিক কো-অপারেশন (সাসেক-২) প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজটি পায় আব্দুল মোনেম লিমিটেড। প্রায় ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ ২০২২ সালে শুরু হয়। তিন বছরের মেয়াদ শেষে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর নাগাদ কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত অর্ধেকের মতো কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ফলে প্রকল্পের মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাসচালক রমিজ উদ্দিন জানান, বর্তমানে সড়কে যানবাহন স্বাভাবিকভাবেই চলাচল করছে। তবে ঈদের সময় গাড়ির চাপ বেড়ে গেলে এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত অংশে যানজট তৈরি হয় এবং এতে চালক-যাত্রী সবাই ভোগান্তিতে পড়েন।
তিনি বলেন, চন্দ্রা থেকে এলেঙ্গা পর্যন্ত চার লেন থাকলেও পরের অংশে এসে যানবাহনের গতি কমে যায়। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
বিজ্ঞাপন
আরেক বাসচালক আকবর হোসেন বলেন, ঈদের সময় মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। বিভিন্ন জায়গায় যাত্রী ওঠানামা এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচলের কারণে যানজট বাড়ে। এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়কটি দুই লেন হওয়ায় সেখানে চাপ আরও বেশি পড়ে।
যাত্রী মানিক মিয়া বলেন, ঈদ এলেই এই মহাসড়কে যানবাহনের চাপ অনেক বেড়ে যায়। তার ওপর সড়কের একটি অংশে উন্নয়ন কাজ চলায় যানজট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। গত ঈদেও এই পথে দীর্ঘ যানজট হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ প্রশাসনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেডের প্রজেক্ট ম্যানেজার রবিউল আওয়াল জানান, এলেঙ্গা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত সড়কের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ায় আরও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর জন্য প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মহাসড়কের বিভিন্ন ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। বর্তমানে আন্ডারপাস, ফ্লাইওভার ও মূল সড়কের কাজ চলমান রয়েছে। ঈদের সময় স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক যানবাহন চলাচলের কারণে সড়কের ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি চাপ পড়ে, যার ফলে যানজট সৃষ্টি হয়। এছাড়া যমুনা সেতুর প্রস্থ তুলনামূলক কম হওয়াও একটি বড় কারণ। সেতুর ওপর দুর্ঘটনা ঘটলে টোল আদায় সাময়িক বন্ধ থাকে এবং দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি সরাতে সময় লাগে, যা যানজট আরও বাড়িয়ে দেয়।
তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ঈদ উপলক্ষে সড়কে চার লেনের সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে যাতে উত্তরবঙ্গগামী মানুষ নির্বিঘ্নে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
যমুনা সেতু সাইট অফিসের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন জানান, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে নানা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেতুর দুই প্রান্তে ৯টি করে মোট ১৮টি টোল বুথ চালু রাখা হবে, যার মধ্যে মোটরসাইকেলের জন্য দুটি করে আলাদা বুথ থাকবে। এছাড়া কর্ণফুলী টানেল এলাকা থেকে অতিরিক্ত রেকার আনা হচ্ছে যাতে সেতুর ওপর কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত গাড়ি সরিয়ে নেওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, সিরাজগঞ্জ অংশে ইতোমধ্যে ছয় লেনের সড়ক নির্মাণ হয়েছে এবং টাঙ্গাইল অংশে রয়েছে চার লেন। কিন্তু সেতুর প্রস্থ তুলনামূলক কম হওয়ায় সেখানে যানবাহনের চাপ বেশি পড়ে। পাশাপাশি ঢাকা থেকে ফিটনেসবিহীন যানবাহন মহাসড়কে প্রবেশ করাও একটি বড় সমস্যা। তবুও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ মিলে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শামসুল আলম সরকার জানিয়েছেন, ঈদকে সামনে রেখে মহাসড়কে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঈদের পাঁচ দিন আগে থেকেই প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। যমুনা সেতু পর্যন্ত মহাসড়কের ১৪টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট চিহ্নিত করে সেখানে তিন শিফটে ২৪ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করবেন পুলিশ সদস্যরা।
তিনি বলেন, মহাসড়কে মোটরসাইকেলে টহল জোরদার করা হবে এবং দুর্ঘটনা মোকাবিলায় রেকার প্রস্তুত রাখা হবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত যানবাহন সরিয়ে নেওয়া যায়। পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে।








