Logo

ডিজিটাল ভূমি সেবায় বদলে যাচ্ছে চিত্র, পাত্তা পাবে না দালালরা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ মে, ২০২৬, ১২:৪১
ডিজিটাল ভূমি সেবায় বদলে যাচ্ছে চিত্র, পাত্তা পাবে না দালালরা
ছবি: সংগৃহীত

দেশে ভূমি সংক্রান্ত সেবা একসময় ছিল সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে জটিল ও ভোগান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়াগুলোর একটি। খতিয়ান তোলা, নামজারি সম্পন্ন করা কিংবা ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের মতো কাজে ইউনিয়ন ভূমি অফিস থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত দিনের পর দিন ঘুরতে হত সেবাগ্রহীতাদের।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘসূত্রতা, অস্বচ্ছতা ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে হিমশিম খেতে হত। তবে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর ফলে এখন সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। অধিকাংশ ভূমি সেবা এখন মোবাইল ফোন ও অনলাইনের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ভূমি সেবা চালু হওয়ায় মানুষের সময় ও খরচ কমেছে, পাশাপাশি সেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বেড়েছে। ফলে দুর্নীতির সুযোগও কমে এসেছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) এমদাদুল হক চৌধুরী জানান, অটোমেশন কার্যক্রমের ফলে এখন মানুষকে সরাসরি ভূমি অফিসে যেতে হচ্ছে না। ঘরে বসেই অনলাইনে বিভিন্ন ভূমি সেবা গ্রহণ করা যাচ্ছে। এতে যেমন দুর্নীতি কমছে, তেমনি সেবা পাওয়া সহজ হচ্ছে। তবে তিনি বলেন, জনগণকে আরও সচেতন হতে হবে, নইলে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি কমানো কঠিন হবে।

বিজ্ঞাপন

‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ভূমি মন্ত্রণালয় ও ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তর (ডিএলআরএস) ধাপে ধাপে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন, ই-নামজারি নিষ্পত্তি, খাজনা পরিশোধ, খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ সংগ্রহ, অভিযোগ দাখিল এবং ভূমি তথ্য যাচাইয়ের মতো সেবা পাওয়া যাচ্ছে।

ঘরে বসেই খাজনা পরিশোধ

বিজ্ঞাপন

আগে ভূমি উন্নয়ন কর বা খাজনা পরিশোধ করতে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানো, একাধিকবার অফিসে যাওয়া এবং অতিরিক্ত সময় ব্যয়ের মতো সমস্যায় পড়তে হত নাগরিকদের। এখন মোবাইল ব্যাংকিং ও অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ের মাধ্যমে ঘরে বসেই কয়েক মিনিটে খাজনা পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ই-পর্চা ও ই-খাজনা কার্যক্রম চালুর পর অনলাইনে কর পরিশোধকারীর সংখ্যা প্রতি বছর বাড়ছে। বর্তমানে বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ মানুষ অনলাইনে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ করছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও রয়েছেন, যারা বিদেশে বসেই নিজেদের জমির খাজনা পরিশোধ করছেন।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন বলেন, আগে খাজনা দিতে পুরো দিন নষ্ট হয়ে যেত। এখন মোবাইলেই কয়েক মিনিটে কাজ সম্পন্ন হচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে রশিদও পাওয়া যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অনলাইনে নামজারিতে স্বস্তি

জমি কেনাবেচার পর মালিকানা হালনাগাদের জন্য নামজারি বা মিউটেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এই প্রক্রিয়াটি ছিল জটিল ও সময়সাপেক্ষ। অনেকেই বাধ্য হয়ে দালালের সহায়তা নিতেন এবং সরকারি ফির চেয়ে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতেন।

বর্তমানে অনলাইনে নামজারি আবেদন চালুর ফলে আবেদনকারী নিজেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করে আবেদন করতে পারছেন। মোবাইল ফোনে আবেদনের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে এবং প্রতিটি ধাপে এসএমএসের মাধ্যমে তথ্য জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটির বেশি ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে আরও প্রায় ৫ লাখ আবেদন বিভিন্ন পর্যায়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাঠ প্রশাসন অনুবিভাগ) নাসরিন জাহান বলেন, অনলাইনে নামজারি ব্যবস্থা চালুর ফলে সেবাগ্রহীতাদের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমেছে। একই সঙ্গে দ্রুত আবেদন নিষ্পত্তির জন্য উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ এখন অনলাইনে

জমি সংক্রান্ত প্রতারণা রোধে খতিয়ান ও মৌজা ম্যাপ যাচাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগে এসব তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে মানুষ ভুয়া কাগজপত্রের ফাঁদে পড়তেন। বর্তমানে অনলাইনে জমির মালিকানা, দাগ নম্বর, খতিয়ান নম্বর এবং জমির পরিমাণ যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী শিমুল চক্রবর্তী বলেন, আগে জমির কাগজ যাচাই করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হত। এখন অনলাইনে সহজেই তথ্য মিলিয়ে নেওয়া যায়।

বিজ্ঞাপন

কমছে দালালচক্রের প্রভাব

একসময় ভূমি অফিসকেন্দ্রিক দালালচক্র সাধারণ মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করত। তথ্যের অভাব ও জটিল প্রক্রিয়ার কারণে অনেকে বাধ্য হয়ে তাদের দ্বারস্থ হতেন।

তবে ডিজিটাল সেবা চালুর ফলে এখন নির্ধারিত ফি ও সময়সীমা অনলাইনে উন্মুক্ত থাকায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি বা অযৌক্তিক বিলম্বের সুযোগ অনেক কমেছে। ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে কোন আবেদন কতদিন ধরে কোন পর্যায়ে রয়েছে, তাও পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। এতে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার শিক্ষক শাহাদাত হোসেন জানান, আগে নামজারি করতে গেলে দালাল ছাড়া কাজ হবে না বলে মনে করা হত। কিন্তু এবার অনলাইনে আবেদন করে সহজেই কাজ সম্পন্ন করেছেন তিনি।

ডিজিটাল ডাটাবেজ গঠনের উদ্যোগ

ভূমি মন্ত্রণালয় দেশের সব খতিয়ান, ভূমি রেকর্ড ও মৌজা ম্যাপ একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ করছে। বিভিন্ন জেলার পুরোনো রেকর্ড ইতোমধ্যে স্ক্যান করে ডিজিটাল আর্কাইভে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভবিষ্যতে জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) প্রযুক্তির মাধ্যমে মানচিত্রভিত্তিক জমির তথ্য দেখার সুবিধা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এতে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ ও মামলা-মোকদ্দমা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে জাল কাগজপত্র শনাক্ত, একই জমি একাধিকবার বিক্রির চেষ্টা প্রতিরোধ এবং আবেদন দ্রুত যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব তোফাজ্জল হোসেন বলেন, অটোমেশন কার্যক্রমের আওতায় ভূমি সেবার সব তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে জমির মানচিত্রভিত্তিক তথ্যসেবা চালু হলে ভূমি বিরোধ ও মামলা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।

সূত্র: বাসস

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD