Logo

যে কারণে ভোটার নিবন্ধনে পরিবারের সবার এনআইডি তথ্য চাইছে ইসি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ জুলাই, ২০২৬, ১৭:৪৪
যে কারণে ভোটার নিবন্ধনে পরিবারের সবার এনআইডি তথ্য চাইছে ইসি
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবস্থায় জালিয়াতি কমাতে এবং ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও নির্ভুল ও নিরাপদ করতে নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রস্তাবিত এই পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভবিষ্যতে নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় আবেদনকারীকে শুধু বাবা-মায়ের নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের—বিশেষ করে ভাইবোনদের—জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যও জমা দিতে হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো একটি সমন্বিত ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে একজন নাগরিকের পারিবারিক পরিচয় সহজেই যাচাই করা সম্ভব হবে এবং রোহিঙ্গাসহ বিদেশি নাগরিকদের ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে বলে মনে করছে কমিশন।

এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে এনআইডি সংশোধনের ক্ষেত্রে যেসব জালিয়াতি ও তথ্য বিকৃতির অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশা করছেন।

পরিবারভিত্তিক তথ্য যাচাইয়ের পরিকল্পনা

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে ভোটার নিবন্ধনের সময় আবেদনকারীকে বাবা ও মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর জমা দিতে হয়। তবে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আবেদনপত্রে ভাইবোনদের এনআইডি তথ্যও যুক্ত করতে হবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের তথ্য একই ডাটাবেজে সংযুক্ত থাকলে সার্ভারের মাধ্যমে পারিবারিক সম্পর্ক সহজেই যাচাই করা যাবে। এতে কেউ যদি ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে পিতা-মাতার পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

একই সঙ্গে উত্তরাধিকার, পারিবারিক সম্পর্ক এবং পরিচয় যাচাইয়ের মতো নানা প্রশাসনিক কাজও সহজ হয়ে যাবে।

রোহিঙ্গা ও বিদেশিদের এনআইডি জালিয়াতি ঠেকানোই মূল লক্ষ্য

ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিয়ানমার থেকে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া ঠেকাতে আগে থেকেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিশেষ পদ্ধতিতে এনআইডি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু এই কঠোর ব্যবস্থার কারণে অনেক রোহিঙ্গা দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে দালালচক্রের সহায়তায় অবৈধভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছে।

এ ছাড়া মাঝেমধ্যে বিদেশি নাগরিকদেরও জাল তথ্য ব্যবহার করে এনআইডি সংগ্রহের অভিযোগ পাওয়া যায়। কমিশনের ধারণা, পরিবারভিত্তিক তথ্য সংযুক্ত করা হলে এ ধরনের প্রতারণার সুযোগ অনেকটাই সীমিত হয়ে যাবে।

এনআইডি সংশোধনে কমবে অনিয়ম

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অনেক নাগরিক বিভিন্ন ব্যক্তিগত বা আর্থিক কারণে পিতা-মাতার নাম, জন্মতারিখ কিংবা অন্যান্য পরিচয়গত তথ্য পরিবর্তনের আবেদন করেন। এসব ক্ষেত্রে কখনো কখনো ভুয়া নথিও জমা দেওয়া হয়।

কিন্তু ভাইবোনদের তথ্যও ডাটাবেজে যুক্ত থাকলে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের তথ্য একে অপরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে। ফলে ভুয়া তথ্য দিয়ে পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা সহজেই ধরা পড়বে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এর ফলে এনআইডি সংশোধনের আবেদনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সেবা প্রতিষ্ঠানও সহজে পরিচয় যাচাই করতে পারবে

নতুন ব্যবস্থায় শুধু নির্বাচন কমিশন নয়, সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন অনুযায়ী নাগরিকের পরিচয় আরও নির্ভুলভাবে যাচাই করতে পারবে।

ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি দপ্তর কিংবা অন্যান্য সংস্থা পারিবারিক তথ্যের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই করতে সক্ষম হবে, যা জালিয়াতি প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

‘ফ্যামিলি ট্রি’ নিয়ে যা বলছে নির্বাচন কমিশন

নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ জানিয়েছেন, ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ব্যবস্থা চালুর বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, নতুন ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের সময় আবেদনকারীকে বাবা-মায়ের পাশাপাশি ভাইবোনদের এনআইডি তথ্যও দিতে হবে। এতে জাতীয় পরিচয়পত্র জালিয়াতি কমবে এবং পরিবারের সব সদস্যের তথ্য একই কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষিত থাকবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এই তথ্যভাণ্ডারের ভিত্তিতে ওয়ারিশ-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের মতো কিছু সেবাও নির্বাচন কমিশন দিতে সক্ষম হতে পারে।

বাধ্যতামূলক হতে পারে এনআইডি নবায়ন

নির্বাচন কমিশন শুধু ভোটার নিবন্ধন নয়, জাতীয় পরিচয়পত্র নবায়ন ব্যবস্থাতেও পরিবর্তনের কথা ভাবছে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান আইনে এনআইডির মেয়াদ ১৫ বছর নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত সময় শেষে নবায়নের বিধান থাকলেও তা কার্যত বাধ্যতামূলক নয়। ফলে দীর্ঘ সময় একই পরিচয়পত্র ব্যবহারের কারণে নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

আরও পড়ুন

কর্মকর্তাদের মতে, ১৫ বছরে একজন মানুষের চেহারায় স্বাভাবিকভাবেই পরিবর্তন আসে। কেউ দাড়ি রাখেন, কারও মুখাবয়ব বয়সের কারণে বদলে যায়, আবার কেউ অস্ত্রোপচার বা অন্যান্য কারণে শারীরিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যান। একই সঙ্গে সময়ের ব্যবধানে আঙুলের ছাপের গুণগত মানেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

এসব কারণে পরিচয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে এবং অসাধু ব্যক্তিরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।

অনলাইনে নবায়নের পরিকল্পনা

ইসি সূত্র জানিয়েছে, এনআইডি নবায়ন বাধ্যতামূলক করার লক্ষ্যে একটি প্রস্তাব ইতোমধ্যে কমিশনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে মেয়াদোত্তীর্ণ জাতীয় পরিচয়পত্রধারীদের নির্ধারিত ফি দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অনলাইনে নবায়নের আবেদন করতে হবে।

নবায়নের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন ছবি, বায়োমেট্রিক তথ্য ও অন্যান্য হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও রাখা হতে পারে বলে জানা গেছে।

এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি

এনআইডি অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এইচ এম আনোয়ার পাশা জানিয়েছেন, পরিবারভিত্তিক তথ্য সংযুক্তকরণ এবং বাধ্যতামূলক এনআইডি নবায়নের বিষয় দুটি এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবগুলো নিয়ে কমিশনের পর্যায়ে আলোচনা চলছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাস্তবায়িত হলে জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, আধুনিক ও জালিয়াতিমুক্ত করার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD