চলতি জুলাই মাসেই চালু হচ্ছে ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড

বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য একক ডিজিটাল সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চলতি মাসেই চালু হতে যাচ্ছে ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড। সরকারের এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রবাসীরা একই প্ল্যাটফর্মে ব্যাংকিং, অনলাইন পেমেন্ট, বীমা, বিনিয়োগ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবা গ্রহণের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি বিমানবন্দর ও বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও দ্রুত হবে বলে জানিয়েছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
বিজ্ঞাপন
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ সফল করতে হলে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতেই উদ্যোগ
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বিমানবন্দর, বিদেশে বাংলাদেশ মিশন, ব্যাংকিং কার্যক্রম এবং সরকারি নানা সেবা নিতে গিয়ে প্রবাসীদের নানা ধরনের জটিলতা ও হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া দালালচক্রের প্রতারণা, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর জটিলতা, দেশে ফিরে সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনসংক্রান্ত সমস্যাও প্রবাসীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। এসব সমস্যার সমাধান এবং সেবা ব্যবস্থাকে আধুনিক ও সহজ করতে সরকার ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
এক কার্ডেই মিলবে নানা সুবিধা
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, নতুন এই কার্ডের মাধ্যমে প্রবাসীরা একটি পরিচয়ের আওতায় একাধিক সরকারি ও আর্থিক সেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
বিশেষ করে বিমানবন্দরে দ্রুত সেবা, বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে অগ্রাধিকার সুবিধা, বিভিন্ন সরকারি ফি অনলাইনে পরিশোধ, ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনা আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানও আরও কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
চলতি মাসেই উদ্বোধনের লক্ষ্য
বিজ্ঞাপন
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানিয়েছেন, দেশের ব্যাংকগুলোর পেমেন্ট গেটওয়ের সঙ্গে সংযুক্ত করে এই ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড চালু করা হবে।
সরকারের লক্ষ্য চলতি মাসের মধ্যেই এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করা।
তিনি বলেন, কার্ডধারীরা দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন সরকারি ও আর্থিক সেবা সহজেই গ্রহণ করতে পারবেন। পাশাপাশি বিমানবন্দর এবং বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে অগ্রাধিকারভিত্তিক সেবাও নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের সদস্যের জন্যও থাকবে সুবিধা
নতুন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্পূরক কার্ড সুবিধা।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, একজন প্রবাসী তাঁর পরিবারের একজন সদস্যকে সম্পূরক কার্ডধারী হিসেবে যুক্ত করতে পারবেন। সেই সদস্য মাসে সর্বোচ্চ কত টাকা উত্তোলন করতে পারবেন, সেটিও আগেই নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। এর ফলে প্রবাসীরা নিজেদের উপার্জিত অর্থের ওপর আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারবেন এবং অর্থের অপব্যবহারের ঝুঁকিও কমবে।
বিজ্ঞাপন
নিরাপদে অর্থ সংরক্ষণের সুযোগ
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রবাসীরা নিজেদের নামে থাকা ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা রাখতে পারবেন এবং সেই অর্থের ওপর নিয়ম অনুযায়ী সুদও পাবেন।
প্রয়োজনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে মনোনীত পরিবারের সদস্য সেই হিসাব থেকে অর্থ উত্তোলন করতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
এতে একদিকে যেমন অর্থ ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, অন্যদিকে আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে অর্থ পাঠাতে গিয়ে যে ধরনের জটিলতা বা প্রতারণার শিকার হতে হয়, সেটিও কমবে বলে মনে করছে সরকার।
হুন্ডি নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্য
ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড চালুর মাধ্যমে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ানোরও পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সরকারের ধারণা, প্রবাসীরা যদি সহজ, নিরাপদ এবং দ্রুত আর্থিক সেবা পান, তাহলে হুন্ডির ব্যবহার কমবে এবং বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর হার বাড়বে। একই সঙ্গে প্রবাসীদের আয়ের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ এবং আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সহজ হবে।
প্রবাসীদের প্রত্যাশা
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সেবা নিতে গিয়ে যে জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড চালু হলে তার অনেকটাই দূর হবে।
বিজ্ঞাপন
তাঁদের আশা, একই কার্ড ব্যবহার করে বিদেশে অর্থ উত্তোলন, বাংলাদেশে আর্থিক লেনদেন এবং সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করা গেলে সময় ও খরচ—উভয়ই কমবে। এতে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সেবা গ্রহণ আরও সহজ ও ঝামেলামুক্ত হবে।
তথ্য নিরাপত্তায় সতর্কতার পরামর্শ
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আরও পড়ুন
সংস্থাটির মতে, প্রবাসীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য সুরক্ষায় শক্তিশালী ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি পুরো কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সমন্বিত একটি ডিজিটাল ডাটাবেজের আওতায় পুরো ব্যবস্থা পরিচালিত হলে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সেবা পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব বা অসাধু চক্রের হস্তক্ষেপ রোধেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সমন্বিত বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব
সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু ডিজিটাল প্রবাসী কার্ড চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে দেশে ও বিদেশে সংশ্লিষ্ট সব সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এই কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ব্যাংক, বিমানবন্দর, বাংলাদেশ দূতাবাস, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের সেবাজট উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
সরকারের প্রত্যাশা, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের জন্য সেবা গ্রহণ হবে আরও সহজ, দ্রুত, নিরাপদ ও স্বচ্ছ।








