Logo

নৈতিক সমর্থন থেকে সরাসরি রাজপথে নামে বিএনপির নেতাকর্মীরা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২৭
নৈতিক সমর্থন থেকে সরাসরি রাজপথে নামে বিএনপির নেতাকর্মীরা
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে ছাত্র-জনতার বৃহৎ গণআন্দোলনে পরিণত হয়। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনের শুরুতে এটি কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে পরিচালিত হয়নি। ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর নেতৃত্বে কর্মসূচি চলতে থাকে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন জানায়। আন্দোলনের বিস্তৃতি এবং সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও সহিংসতা বাড়তে থাকলে দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন প্রকাশ্যে সংহতি প্রকাশ করে।

বিএনপির নেতাদের দাবি, আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ে দলটি সচেতনভাবেই সরাসরি দলীয় ব্যানারে কর্মসূচি দেয়নি। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের স্বতন্ত্র চরিত্র বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই তারা নৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থনের অবস্থান নেয়। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দলীয় নেতাকর্মীদের আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সময়ে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখা হয় বলেও দলটির নেতারা দাবি করেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

৬ জুলাই বিএনপির আনুষ্ঠানিক সমর্থন

বিজ্ঞাপন

কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর, ৬ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিএনপি প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। সে সময় দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বার্থে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে বিএনপি একমত এবং সরকারকে দ্রুত বিষয়টি সমাধানের আহ্বান জানান।

সরকারের অভিযোগ, বিএনপির অস্বীকার

আন্দোলনের তীব্রতা বাড়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার অভিযোগ তোলে, বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের মধ্যে প্রবেশ করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সে সময় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা আন্দোলনের পেছনে বিএনপির সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনেন।

বিজ্ঞাপন

তবে একই সময়ে বিএনপি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর স্পষ্টভাবে জানান, দলটি আন্দোলনে সরাসরি নেতৃত্ব দিচ্ছে না; বরং শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির প্রতি নৈতিক সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছে।

পরবর্তীতে এক সাক্ষাৎকারে মির্জা ফখরুল বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীরা অনেক সময় রাজনৈতিক দলের প্রকাশ্য উপস্থিতি পছন্দ করে না। সে কারণেই বিএনপি মাঠপর্যায়ে সম্পৃক্ত থাকলেও প্রকাশ্যে দলীয় পরিচয়ে আন্দোলনকে সামনে আনেনি বলে তিনি ব্যাখ্যা দেন।

তার দাবি, আন্দোলনের সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়েও আলোচনা হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচির সময়সূচি একদিন এগিয়ে আনার বিষয়েও ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় ঐক্যের আহ্বান

আন্দোলনের শেষ দিকে সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বাড়তে থাকলে বিএনপি সরকারের পদত্যাগ এবং জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানায়। একই সময়ে আন্দোলনের কয়েকজন সমন্বয়ককে চিকিৎসাধীন অবস্থা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

নিহত ও গ্রেপ্তারের দাবি

বিজ্ঞাপন

বিএনপির দাবি অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে দলটির ৪২২ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং প্রায় ৯ হাজার নেতাকর্মী গ্রেপ্তার হন। নিহত ও গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় ও জ্যেষ্ঠ নেতারাও ছিলেন বলে দাবি করা হয়।

দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি যদি আন্দোলনে অংশ না নিত, তাহলে তাদের এত বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ও হতাহতের শিকার হতেন না। তার মতে, আন্দোলনের শুরু থেকেই বিএনপি শিক্ষার্থীদের ঘোষিত কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে মাঠে সক্রিয় ছিল।

তিনি আরও বলেন, জুলাই আন্দোলনের অনেক আগ থেকেই বিএনপি গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাই আন্দোলনে বিএনপির অংশগ্রহণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেছে।

বিজ্ঞাপন

'মাস্টারমাইন্ড' বিতর্ক

জুলাই আন্দোলনের পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি আন্দোলনের মূল পরিকল্পনাকারী সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। বিএনপির কিছু নেতা তারেক রহমানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা বললেও তারেক রহমান নিজেই এক সাক্ষাৎকারে নিজেকে আন্দোলনের 'মাস্টারমাইন্ড' বলতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি এটিকে গণতন্ত্রপন্থী বিভিন্ন শক্তির সম্মিলিত আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করেন।

ছাত্রদল ও সহযোগী সংগঠনের ভূমিকার দাবি

বিজ্ঞাপন

বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের দাবি, আন্দোলনের শুরু থেকেই তাদের নেতাকর্মীরা ধাপে ধাপে সম্পৃক্ত ছিলেন। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, ২ জুলাই থেকে তারা আন্দোলনে অংশ নিতে শুরু করে এবং ১১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে সমর্থনের ঘোষণা দেয়।

ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির বলেন, প্রথমদিকে অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত নেতাকর্মীদের মাধ্যমে অংশগ্রহণ শুরু হলেও পরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বসহ সারা দেশের নেতাকর্মীরা আন্দোলনের সামনের সারিতে অবস্থান নেন। তার দাবি, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্রদলের ১৪২ জন নেতাকর্মী নিহত হন এবং বহু নেতা আহত ও গুলিবিদ্ধ হন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

স্বেচ্ছাসেবক দলের পক্ষ থেকেও দাবি করা হয়, সংগঠনটির নেতাকর্মীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনের কর্মসূচিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৬ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারা অংশ নেন এবং শতাধিক নেতাকর্মী গ্রেপ্তার ও দুই শতাধিক আহত হন।

বিজ্ঞাপন

জুলাই আন্দোলনের লক্ষ্য বাস্তবায়নের প্রত্যাশা

বিএনপির নেতাদের মতে, জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল শুধু কোটা সংস্কার নয়; বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং রাষ্ট্র সংস্কার নিশ্চিত করা।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করেছে। তবে যেসব সংস্কার এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে, সেগুলো নির্বাচিত সরকার হিসেবে বিএনপি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের চেষ্টা করবে।

একই ধরনের মন্তব্য করেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসিরও। তার মতে, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, মানবিক মর্যাদা, সাম্যভিত্তিক রাষ্ট্র, দুর্নীতি দমন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, শিক্ষা সংস্কার এবং অর্থ পাচার রোধ—এসবই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রত্যাশা ছিল। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে আন্দোলনের চেতনা আরও সুসংহত হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD