Logo

শেখ হাসিনার পতনের আগে ৭২ ঘণ্টায় যা ঘটেছিল বাংলাদেশে

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৩
শেখ হাসিনার পতনের আগে ৭২ ঘণ্টায় যা ঘটেছিল বাংলাদেশে
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। শুরুতে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল কোটা ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি। তবে পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায় এবং আগস্টের শুরুতে আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ। মাত্র ৭২ ঘণ্টার নাটকীয় ঘটনাপ্রবাহের পর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন।

বিজ্ঞাপন

আন্দোলনের মোড় ঘুরে যায় ৩ আগস্ট

২ আগস্ট পর্যন্ত অনেকের ধারণা ছিল, আন্দোলনটি কোটা সংস্কারের দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে। কিন্তু ৩ আগস্ট রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিশাল সমাবেশ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবি ঘোষণা করা হয়।

সমাবেশে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, বর্তমান সরকারের আর ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার নেই। তিনি শুধু পদত্যাগ নয়, আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগের বিচারও দাবি করেন।

বিজ্ঞাপন

একই সমাবেশ থেকে প্রথমে ৬ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও পরদিন সেটি একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। এই সিদ্ধান্ত আন্দোলনের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়।

আন্দোলনের পেছনে দীর্ঘ সংঘাতের প্রেক্ষাপট

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, প্রাণহানি এবং সহিংসতা বাড়তে থাকে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে তদন্ত কমিশন গঠন করলেও আন্দোলন থামানো সম্ভব হয়নি। জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে রাজধানীর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

সরকারি হিসাবে আন্দোলন চলাকালে ৮০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে জুলাই-আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জন নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

২ আগস্ট: গণমিছিল, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও নতুন কর্মসূচি

বিজ্ঞাপন

২ আগস্ট সারা দেশে গণমিছিল কর্মসূচি পালিত হয়। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের খবর আসে।

একই দিনে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী, পেশাজীবী ও সাধারণ মানুষের বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। আন্দোলনের সমন্বয়করা অভিযোগ করেন, তাদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ভিডিও ধারণে চাপ দেওয়া হয়েছিল।

সেদিনই ৩ আগস্ট বিক্ষোভ মিছিল এবং ৪ আগস্ট থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের বিচার, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মুক্তি, কারফিউ প্রত্যাহার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়ার দাবিতে বিভিন্ন সংগঠনও পৃথক কর্মসূচি পালন করে।

বিজ্ঞাপন

এদিন মোবাইল ইন্টারনেটে ফেসবুক ও টেলিগ্রাম কয়েক ঘণ্টার জন্য বন্ধ রাখা হয়। একই সময়ে ইউনিসেফ আন্দোলন ঘিরে শিশু নিহত হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে।

৩ আগস্ট: এক দফার ঘোষণা

৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে লাখো মানুষের উপস্থিতিতে আন্দোলন নতুন মোড় নেয়। সেদিন সরকার পতনের এক দফা দাবি এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে শেখ হাসিনা আন্দোলনকারীদের আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে গণভবনের দরজা খোলা রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। তবে আন্দোলনের সমন্বয়করা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তারা জানান, সহিংসতার পর সংলাপের সুযোগ আর নেই।

একই দিনে বিএনপি সরকারকে অবিলম্বে পদত্যাগের আহ্বান জানায়। সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানও সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং পরে আইএসপিআরের মাধ্যমে জানানো হয়, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জনগণের পাশে থাকবে।

৪ আগস্ট: সহিংসতা ও 'মার্চ টু ঢাকা'

বিজ্ঞাপন

৪ আগস্ট শুরু হয় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন। দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর আসে। কয়েকটি এলাকায় পুলিশ সদস্যসহ বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে।

সরকার মোবাইল ইন্টারনেটের ফোর-জি সেবা বন্ধ করে এবং সন্ধ্যা থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করে। একই সঙ্গে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেওয়া হয়।

সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অন্তর্বর্তী সরকারের একটি রূপরেখা প্রকাশ করেন। অন্যদিকে শাহবাগে সমাবেশ থেকে ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। আন্দোলনের নেতারা সারা দেশের মানুষকে ঢাকায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান।

বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট: সরকারের পতন

৫ আগস্ট সকাল থেকেই কারফিউ উপেক্ষা করে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ 'মার্চ টু ঢাকা' কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর দিকে রওনা হন।

একই সময়ে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তিন দিনের সাধারণ ছুটি কার্যকর হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন থাকলেও বহু স্থানে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে এগিয়ে যান।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

দুপুরের দিকে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেছেন—এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। পরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও তার ভারতগমনের খবর প্রকাশ করে।

এর কিছুক্ষণ পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান রাজনৈতিক দল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন এবং একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হবে।

পতনের পর নতুন বাস্তবতা

সেনাপ্রধানের ঘোষণার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় আনন্দ মিছিল শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করেন। একই সময়ে বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনাও ঘটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সেদিন রাতেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন জাতির উদ্দেশে ভাষণে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা জানান, তাদের প্রস্তাবিত কাঠামোর বাইরে কোনো সরকারকে তারা সমর্থন করবেন না।

পরদিন ৬ আগস্ট ভোর থেকে দীর্ঘদিন পর কারফিউ প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়, যার প্রভাব এখনো দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD