নতুন সমীকরণে স্থানীয় নির্বাচন, তৃণমূলে বাড়ছে দায়বদ্ধতা

তৃণমূলের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, ভোটারদের আস্থা অর্জন এবং নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণের কাছে জবাবদিহি—এই তিন বিষয়কে ঘিরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। দলীয় প্রতীক না থাকায় প্রার্থীদের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ও স্থানীয় পর্যায়ের জনসম্পৃক্ততাও এবার নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
বিজ্ঞাপন
জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলকে তৃণমূল পর্যায়ে আরও সংগঠিত ও সক্রিয় করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রমের পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হলে তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যোগাযোগ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এলাকার উন্নয়ন, নাগরিক সেবা এবং স্থানীয় সমস্যার সমাধানে জনপ্রতিনিধিদের দায়বদ্ধতাও বাড়ার সুযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি দায়িত্ববোধও তৈরি হয়েছে। তারা নিজেদের উদ্যোগে ভোটারদের খোঁজখবর নিচ্ছেন এবং এলাকার বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের বিষয়ে ভূমিকা রাখছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তিনি বলেন, রাস্তাঘাট সংস্কার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা এবং স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে নেতাকর্মীরা কাজ করছেন। এর ফলে ভোটারদের সঙ্গে তাদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ও বাড়ছে। নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখতে তারা এলাকায় সময় দিচ্ছেন এবং স্থানীয় বিরোধ ও সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখছেন। এতে নির্বাচনের আগেই জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগ ও দায়বদ্ধতার সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে।
মীর শাহে আলম বলেন, এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। ফলে ভোটাররা প্রার্থীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, গ্রহণযোগ্যতা এবং এলাকার মানুষের জন্য তার ভূমিকা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবেন। সাম্প্রতিক এক বক্তব্যেও তিনি জানিয়েছেন, দলীয় প্রতীক না থাকলেও বিএনপি স্থানীয়ভাবে সমর্থিত প্রার্থীকে সহযোগিতা করতে পারে।
তিনি আরও বলেন, স্থানীয়ভাবে বিএনপি-সমর্থিত নির্দিষ্ট প্রার্থী থাকতে পারেন। তবে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করার সুযোগ থাকবে না। গ্রহণযোগ্য ও জনপ্রিয় প্রার্থীকে সামনে আনার বিষয়টিই গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে আয়োজনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী। কোনো প্রার্থী কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে যুক্ত, সেটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত হলেও নির্বাচন পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় থাকবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে বিএনপিও স্থানীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দলটির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় নির্বাচনে বিভিন্ন স্তরে সমর্থিত প্রার্থী দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এর আগে নেতাকর্মীদের যোগ্য প্রার্থী যাচাই করে তাদের সমর্থনে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও তিনি বলেছেন।
বিজ্ঞাপন
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্ব গ্রহণ করলে জনগণের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা বাড়ার সুযোগ থাকে।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পর এলাকার মানুষের সমস্যা, উন্নয়ন ও নাগরিক সেবার সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয়।
অন্যদিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনও প্রস্তুতি শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনের দিন-তারিখ নির্ধারণের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন পর্যায়ক্রমে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকার বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব নির্বাচন সম্পন্ন করতে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের প্রাক্কলনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কয়েক ধাপে আয়োজনের বিষয়ে নির্বাচন কমিশন প্রাথমিক প্রস্তুতি নিচ্ছে। প্রস্তাবিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রথম ধাপের ভোট ১২ নভেম্বর, দ্বিতীয় ধাপ ১৩ ডিসেম্বর, তৃতীয় ধাপ ৩০ ডিসেম্বর, চতুর্থ ধাপ আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, পঞ্চম ধাপ ৪ ফেব্রুয়ারি, ষষ্ঠ ধাপ ২২ এপ্রিল এবং সপ্তম ধাপ ২৭ মে আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ হিসেবে রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের মধ্যে রয়েছে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন। এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পদে সরাসরি ও পরোক্ষ—দুই পদ্ধতিতে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য, পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলর, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান এবং সিটি করপোরেশনের মেয়র ও কাউন্সিলররা সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। অন্যদিকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের ভোটে পরোক্ষভাবে নির্বাচিত হন।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন আইন অনুযায়ী এসব নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ইউনিয়ন পরিষদ আইন অনুযায়ী, কমিশন নির্ধারিত বিধি অনুসারে চেয়ারম্যান ও সদস্য নির্বাচন আয়োজন, পরিচালনা ও সম্পন্ন করে। ভোটগ্রহণের তারিখ, সময়, স্থান এবং নির্বাচন পরিচালনার অন্যান্য বিষয় নির্ধারণের ক্ষমতাও কমিশনের রয়েছে। উপজেলা পরিষদ আইনেও নির্বাচন পরিচালনা নিয়ে একই ধরনের বিধান রয়েছে।
ফলে এবারের স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের আয়োজন নয়, বরং তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠন, স্থানীয় নেতৃত্ব, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের সম্পর্কের নতুন কাঠামো তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে সামনে আসছে।








