Logo

রংপুরে ৪ খুনের ঘটনায় দুই আসামির করা হবে ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
রংপুর
২৭ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:৪৩
রংপুরে ৪ খুনের ঘটনায় দুই আসামির করা হবে ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট
ছবি: সংগৃহীত

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে নতুন তথ্য পেয়েছে পুলিশ। গ্রেপ্তার দুই আসামি সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাসের ডিএনএ পরীক্ষা এবং ডোপ টেস্ট করা হবে। পাশাপাশি ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ১০টায় সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।

তিনি জানান, চারজনের হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটক সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধের কাছ থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে তাদের ডোপ টেস্টের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া তথ্য পরস্পরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, নিহত গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থীর শরীরে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তে তাদের মৃত্যুর কারণ হিসেবে শ্বাসরোধ বা গলায় ফাঁস দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

জবানবন্দিতে ইয়াবা সেবনের তথ্য

আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে কমিশনার জানান, সিদ্ধার্থ স্বর্ণের দোকানের কারিগর হিসেবে কাজ করতেন। গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির পাশেই তাদের বাড়ি ছিল। যে জমিতে গণপতি চক্রবর্তী বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন, সেটি আগে সিদ্ধার্থদের পূর্বপুরুষদের মালিকানাধীন ছিল বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি আগে মাঝে মধ্যে উৎসবের সময় ইয়াবা সেবন করলেও ঘটনার আগের এক মাস ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার ইয়াবা সেবন করতেন। ঘটনার রাতে তিনি মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত নামের এক ব্যক্তির বাসায় যান। সেখানে দুজন ইয়াবা সেবন করেন। পরে আরও ইয়াবা সংগ্রহের জন্য শান্ত নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই ইয়াবা ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তাকে আইনের আওতায় আনা গেলে তদন্তে আরও তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে আশা করছে পুলিশ।

বিজ্ঞাপন

ছাদে গিয়ে গণপতিকে দেখতে পাওয়ার দাবি

জবানবন্দি অনুযায়ী, রাতের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ দেয়াল টপকে পাশের একটি বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেখান থেকে অল্প দূরত্বের আরেকটি ছাদে গিয়ে পানির ট্যাংকির আড়ালে অবস্থান নেন। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করেন।

সিদ্ধার্থের বক্তব্য অনুযায়ী, সেদিন তারা মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন। অন্যদিকে মুগ্ধের জবানবন্দিতে নয়টি ইয়াবা সেবনের কথা বলা হয়েছে। পুলিশ বলছে, দুই বক্তব্যের মধ্যে এই পার্থক্যটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ভোরে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে গিয়ে তাদের দেখতে পান বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি তাদের সেখানে থাকার কারণ জানতে চান। এ সময় ধরা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় দুই আসামির সঙ্গে তাঁর তর্কাতর্কি হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এরপর গণপতি চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ময়নাতদন্তে পাওয়া মৃত্যুর কারণের সঙ্গে আসামিদের জবানবন্দির এই অংশের মিল রয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কমিশনার।

স্ত্রী ও মেয়েকেও হত্যার অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

গণপতির মরদেহ আড়াল করার সময় তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে বিষয়টি টের পেয়ে ছাদে চলে আসেন বলে জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। তারা চিৎকার করলে আসামিরা তাদেরও শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরে মরদেহগুলো এমনভাবে রাখা হয়, যাতে পাশের বাড়ির ছাদ থেকে সহজে দেখা না যায়। এরপর আসামিরা নিচতলায় গিয়ে বাড়িতে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে বৈদ্যুতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

শিশুকে ঘুম থেকে ওঠার পর হত্যার দাবি

বিজ্ঞাপন

তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নতুন তথ্য হিসেবে এসেছে নিহত পরিবারের শিশুটিকে নিয়ে। পুলিশ কমিশনার জানান, প্রথম দিকে পুলিশ শিশুটি ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল বলে তথ্য পেয়েছিল। কিন্তু আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আসামিরা দাবি করেছেন, ঘটনার সময় শিশুটি ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে চিনতে পারে এবং তাঁকে ‘সিদ্ধার্থ দাদা’ বলে ডাকে।

শিশুটি তাদের পরিচয় অন্যদের জানিয়ে দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় তাকেও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় বলে জবানবন্দিতে বলা হয়েছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে পাওয়া নতুন তথ্যগুলো তদন্তের অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা

জবানবন্দি অনুযায়ী, চারজনকে হত্যার পর ঘটনাটিকে চুরি বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র এলোমেলো করা হয় এবং অলংকার ও নগদ টাকা নেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আসামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, বাড়ি থেকে ১৫ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল। পরে সিদ্ধার্থ তাঁর ভাগের ৩ হাজার ৫০০ টাকা নিয়ে বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন। স্বর্ণালংকারগুলোও বাড়ির বাইরে নিয়ে গিয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তদন্তে যেসব ব্যক্তির নাম এসেছে, তাদের কেউ কেউ ঘটনার বিষয়ে কিছু জানতেন না বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় নারীর সাক্ষ্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ

পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের সময় চিৎকারের ঘটনা একজন স্থানীয় নারী শুনেছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। তিনি পুলিশকে এ বিষয়ে জানানোর পর তাঁর স্বামী তাঁকে মারধর করেছেন বলেও জানা গেছে।

পুলিশ কমিশনার বলেন, এমন চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো ঘটনা দেখে বা শুনে থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানো উচিত।

তদন্তের অংশ হিসেবে এখন দুই আসামির ডিএনএ ও ডোপ টেস্ট, ময়নাতদন্তের তথ্য, জবানবন্দি এবং অন্যান্য আলামত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব তথ্যের সমন্বিত বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত এবং ঘটনার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD