Logo

সংসদ তোষামোদের জায়গা নয়, করের টাকায় যেন চরিত্রহনন না করা হয়

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুন, ২০২৬, ১২:৫৭
সংসদ তোষামোদের জায়গা নয়, করের টাকায় যেন চরিত্রহনন না করা হয়
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে ব্যক্তি-তোষণ, অযথা প্রশংসা এবং চরিত্রহননের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় সংসদ কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি তোষামোদ প্রদর্শনের জায়গা নয়; এটি জনগণের প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীলভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সর্বোচ্চ মঞ্চ। জনগণের করের টাকায় সংসদে যেন আর কাউকে হেয়প্রতিপন্ন বা চরিত্রহননের রাজনীতি না করা হয়, সে বিষয়ে স্পিকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা।

তিনি বলেন, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকাটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। সবার মতামত যদি এক হয়ে যেত, তাহলে দীর্ঘ আলোচনা বা বিতর্কের প্রয়োজন থাকত না। জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা নিজেদের বিবেক, স্রষ্টা এবং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাজেট অধিবেশন সংসদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনগুলোর একটি। কারণ, এই বাজেটের ওপরই একটি অর্থবছরের উন্নয়ন কার্যক্রম ও রাষ্ট্র পরিচালনার দিকনির্দেশনা নির্ভর করে। তাই সব সদস্যই দায়িত্ববোধ থেকে তাদের মতামত তুলে ধরেছেন।

বক্তব্যে তিনি দেশের বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও জাতীয় ব্যক্তিত্বদের অবদানের কথা স্মরণ করেন। একই সঙ্গে ১৯৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবরের ঘটনা, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং দীর্ঘ সময়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নিহত ও নির্যাতিতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিও গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

নিজ দলের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একে একে ১১ জন জ্যেষ্ঠ নেতাকে হারিয়েছে তার দল এবং বর্তমানে তিনি সেই ধারাবাহিকতার জীবিত সদস্যদের একজন। পিলখানার হত্যাকাণ্ডকে জাতির জন্য গভীর ক্ষতি হিসেবে উল্লেখ করে নিহত সেনাসদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সংসদকে তিনি ‘মজলুমের পার্লামেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এই সংসদের কর্মকাণ্ড এমন হওয়া উচিত নয় যাতে সাধারণ মানুষ কষ্ট পায়। বরং সংসদ দেশের মানুষের মধ্যে আস্থা, আশা এবং জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।

বাজেট নিয়ে আলোচনায় তিনি বলেন, শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, একটি বাজেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সংসদকে একটি যানবাহনের সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, সরকারি দল ও বিরোধী দল এই ব্যবস্থার দুটি চাকার মতো। যেকোনো একটি অকার্যকর হয়ে গেলে পুরো সংসদীয় ব্যবস্থাই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই উভয় পক্ষের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের বিরোধিতা করবে না, আবার সরকারও বিরোধী মতকে উপেক্ষা করতে পারে না। গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখতে উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার মনোভাব প্রয়োজন।

অতীতে সংসদে ব্যক্তিকে খুশি করতে গান, কবিতা বা অতিরঞ্জিত প্রশংসা করার প্রবণতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব অপসংস্কৃতি আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। জনগণের অর্থ ব্যয় করে সংসদকে তোষামোদের মঞ্চে পরিণত করা অনুচিত। পাশাপাশি কাউকে খুশি করতে গিয়ে অন্যের সম্মানহানি বা চরিত্রহননের যে সংস্কৃতি অতীতে ছিল, সেটিও সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

অর্থমন্ত্রীর প্রশংসা করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সীমিত সময়ের মধ্যে একটি সংকটাপন্ন অর্থনীতির বাস্তবতায় ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট প্রণয়ন করা সহজ কাজ ছিল না। তবে মানুষের তৈরি কোনো কাজই ত্রুটিমুক্ত নয়। সে কারণে বাজেটের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করে জনগণের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংশোধনের প্রস্তাব দেওয়াই বিরোধী দলের দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, বিরোধী দল মূলত রাষ্ট্রের একটি ‘ওয়াচডগ’ বা প্রহরীর ভূমিকা পালন করে। বাজেট বাস্তবায়নের সময় কোথাও জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে কি না কিংবা কোনো খাতে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে কি না—সেসব বিষয়ে নজরদারি করাই বিরোধী দলের দায়িত্ব।

সরকারি দলের কেউ সমালোচনাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, আবার কেউ অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মতের এই বৈচিত্রই সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিরোধী ও সরকারি দল—উভয় পক্ষের যৌক্তিক প্রস্তাব বিবেচনায় নিয়ে অর্থমন্ত্রী সংশোধিত বাজেটে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনবেন।

বিজ্ঞাপন

বাজেট বাস্তবায়ন ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রস্তাবও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত অর্থবছর হওয়ায় শেষদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই অনেক উন্নয়নকাজ তাড়াহুড়ো করে সম্পন্ন করতে হয়। এতে বছরের অধিকাংশ সময় কাজের গতি কম থাকলেও শেষ সময়ে ব্যয় ও অনিয়মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতি এড়াতে তিনি বাংলাদেশের অর্থবছরকে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্যালেন্ডার বর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন।

তিনি আরও বলেন, বাজেট সংসদে অনুমোদিত হলেও এর সফল বাস্তবায়নের দায়িত্ব মূলত নির্বাহী বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর বর্তায়। তাই জনগণের করের অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় এবং উন্নয়ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD