ডিসেম্বরে দেশে ফিরে স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করবে হাসিনা: রয়টার্স

ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বর দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন তিনি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি এ দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছাড়েন শেখ হাসিনা। বর্তমানে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। এদিকে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটেই প্রথমবারের মতো দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে জানান তিনি।
প্রায় এক ঘণ্টাব্যাপী ওই সাক্ষাৎকারে ৭৮ বছর বয়সী শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান। তাদের সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করা হয়, সেটিও দেখতে চান বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশে ফিরে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি প্রাণহানির আশঙ্কাও রয়েছে। তারপরও নিজের দেশে ফিরতেই হবে। তার ভাষায়, দলের নেতাকর্মীরা কঠিন দমন-পীড়নের মুখে রয়েছেন। মৃত্যুও যদি আসে, তবে সেটি নিজের দেশেই হোক—যেখানে তার বাবা-মায়ের কবর রয়েছে এবং তাদের রক্তের স্মৃতি জড়িয়ে আছে।
বিজ্ঞাপন
টানা কয়েক মেয়াদে প্রায় দুই দশক ক্ষমতায় থাকার পর গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। পরবর্তীতে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিভাজনের সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে তাকে ফেরত দিলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক টানাপোড়েন কিছুটা প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে তাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে একাধিকবার অনুরোধ জানিয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
নির্বাসনে যাওয়ার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লিখিত বক্তব্য দিলেও এবারই প্রথম সরাসরি কোনো সাক্ষাৎকার দেন শেখ হাসিনা। তিনি জানান, দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেননি। একই সঙ্গে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতাদের একযোগে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথাও প্রথমবারের মতো প্রকাশ করেন।
তার দাবি, বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরাতে ভারতের কাছে ধারাবাহিকভাবে চিঠি পাঠাচ্ছে। তবে তিনি নিজ উদ্যোগেই দেশে ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান।
রয়টার্স জানায়, শেখ হাসিনার বক্তব্যের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের মুখপাত্রদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে গত এপ্রিলে তারা জানিয়েছিল, বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ অনুরোধ পর্যালোচনায় রয়েছে এবং নতুন সরকারের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক জোরদারে ভারত আগ্রহী।
বিজ্ঞাপন
শেখ হাসিনা আরও বলেন, দেশের প্রায় সব আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকে আত্মগোপনে রয়েছেন। তাদের উদ্দেশে তিনি দেশে ফিরে একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও তিনি কবে বা কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাননি।
তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার ওপর তার আস্থা রয়েছে। আইনি প্রক্রিয়া শুরু হলে আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণ নিজেরাই মূল্যায়ন করতে পারবেন বলে তার বিশ্বাস।
দেশে ফেরার বিষয়ে সরকারের সঙ্গে কোনো গোপন যোগাযোগ হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং ন্যায়বিচারের মতো বিষয় গোপন আলোচনার বিষয় হতে পারে না।
বিজ্ঞাপন
কারাগারে যেতে ভয় পান না বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অতীতেও একাধিকবার গ্রেপ্তার হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক জীবনে বিভিন্ন সময় তাকে কারাবরণ করতে হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ১৯৭৫ সালে পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে বহুবার গ্রেপ্তার হন। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি হয়েছিলেন। পরে মুক্তি পেয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হন।
তবে ২০২৪ সালে দেশ ছাড়ার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিক্ষুব্ধ জনতা তার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকায় দেশ ত্যাগ করেছিলেন।
বিজ্ঞাপন
শেখ হাসিনা বলেন, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুলত্রুটি হতে পারে। তবে একটি সরকারের ভালো-মন্দের চূড়ান্ত বিচার করার অধিকার জনগণেরই রয়েছে, সেই বিচার তিনি জনগণের ওপর ছেড়ে দিয়েছেন।
আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টি আসনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, তাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করা হলেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার যৌক্তিকতা নেই। দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তার বিচার জনগণই করবে।
সূত্র: রয়টার্স








