গণভোটের ম্যান্ডেট পাশ কাটিয়ে সংবিধান সংশোধন নয়: গোলাম পরওয়ার

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, গণভোটে জনগণ যে সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়ার অনুমোদন দিয়েছেন, তা পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে বিকল্প কোনো প্রক্রিয়া গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছাকে সাধারণ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধীন করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবিধান সংশোধনবিষয়ক বিশেষ কমিটির কার্যক্রম নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান তুলে ধরতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন গোলাম পরওয়ার।
তিনি বলেন, ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়। গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদে থাকা সাংবিধানিক সংস্কার এবং তা বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। সরকারি গেজেট অনুযায়ী, বৈধ ভোটের ৬৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়ে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গোলাম পরওয়ারের দাবি, গণভোটে জনগণ শুধু পৃথক কিছু সাংবিধানিক প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন দেননি; সংবিধান সংস্কারের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকেও অনুমোদন করেছেন। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা।
বিজ্ঞাপন
তার অভিযোগ, ১১ দলীয় ঐক্যের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্যরা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, সংসদ সদস্য হিসেবে পাওয়া ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের গণভোটে অর্পিত ক্ষমতা এক নয়। একই ব্যক্তি দুটি প্রতিষ্ঠানের সদস্য হলেও প্রতিষ্ঠান দুটির ক্ষমতার উৎস, আইনগত পরিচয় ও দায়িত্ব আলাদা।
গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য, জাতীয় সংসদ সংবিধান দ্বারা সৃষ্ট একটি ‘Constituted Body’। বিপরীতে সংবিধানের মৌলিক পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে জনগণই চূড়ান্ত সার্বভৌম ক্ষমতার উৎস। সাংবিধানিক পরিভাষায় জনগণের এই গাঠনিক ক্ষমতাকে ‘Constituent Power’ বলা হয়।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, সংবিধান সংসদ সৃষ্টি করে, সংসদ জনগণকে নয়। ফলে জনগণ সরাসরি গণভোটের মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট সংস্কার প্রক্রিয়া অনুমোদন করে সেটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ওপর দিলে, সাধারণ সংসদীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করে তার বিকল্প প্রক্রিয়া তৈরি করা গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে।
১১ দলীয় ঐক্যের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটের রায়কে কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা বা সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রহণ, বর্জন কিংবা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রসঙ্গে গোলাম পরওয়ার বলেন, জাতীয় সংসদকে সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা দেওয়া হলেও তা সীমাহীন নয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে প্রতিষ্ঠিত ‘Basic Structure Doctrine’ অনুসারে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সাধারণ সংশোধনী ক্ষমতার মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না।
বিজ্ঞাপন
তিনি পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ ও ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের নজিরও তুলে ধরেন। তার মতে, সংসদের ক্ষমতার উৎস সংবিধান, আর ‘Constituent Power’-এর উৎস জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দীর্ঘ আলোচনা ও মতবিনিময়ের পর জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ প্রণীত হয়। পরে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ জারি করা হয়।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ‘হ্যাঁ’ বলার পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংস্কার সম্পন্ন করার কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বিএনপির ৩১ দফার প্রসঙ্গ টেনে গোলাম পরওয়ার প্রশ্ন করেন, যে বিষয়টি বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রথম দফায় রাষ্ট্র ও সাংবিধানিক সংস্কার হিসেবে উপস্থাপন করেছে, ক্ষমতায় এসে সেটিকে কেন শুধু সংসদীয় সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, জনগণের ম্যান্ডেটের বিকল্প সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয় এবং জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার বিকল্প কোনো বিশেষ কমিটিও হতে পারে না। সংসদ গুরুত্বপূর্ণ হলেও জনগণই সার্বভৌম।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি তুলে ধরেন গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত ও গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর করা, অনুমোদিত প্রক্রিয়া পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কারের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে পরিষদকে কার্যকর করা।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া গণভোটের ম্যান্ডেট ও জনগণের সম্মতি পাশ কাটিয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো-সংশ্লিষ্ট পরিবর্তনের উদ্যোগ থেকে বিরত থাকা এবং জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় ও রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সংবিধানের চূড়ান্ত ক্ষমতার উৎস জনগণ। সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা অর্পিত ক্ষমতা, আর জনগণের ‘Constituent Power’ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তৃত্বের মূল উৎস। তাই গণভোটের মাধ্যমে দেওয়া সাংবিধানিক ম্যান্ডেট ও অনুমোদিত প্রক্রিয়ার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি জানান, ১১ দলীয় ঐক্য গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের গণরায়ের বাস্তবায়ন এবং জনগণের সার্বভৌম সাংবিধানিক অধিকারের পক্ষে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।








