জেনে নিন ফিতরা আদায়ের সঠিক সময়

রমজান মাস হচ্ছে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস। এ মাসে রোজা এবং সালাতের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের মধ্যে একটি হলো সাদাকাতুল ফিতর, বা সংক্ষেপে ফিতরা। ফিতরা কেবল আর্থিক দান নয়, এটি রোজাদারের আত্মশুদ্ধি, দরিদ্রদের মুখে ঈদের হাসি ফোটানো এবং সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার এক অসাধারণ ইসলামী বিধান।
বিজ্ঞাপন
ফিতরা কী এবং কেন দেওয়া হয়
ফিতরা শব্দটি “ফিতর” ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘সমাপ্তি’। রমজানের সিয়াম সমাপ্তির প্রাক্কালে এটি আদায় করা হয়। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ফিতরা ফরজ করেছেন রোজাদারের ত্রুটি-মাফ ও মিসকিনদের আহারের ব্যবস্থা করার জন্য।
বিজ্ঞাপন
ফিতরা মূলত—
রোজার ত্রুটি-বিচ্যুতির কাফফারা,
দরিদ্রদের ঈদের দিনে খাদ্য নিশ্চিত করা,
বিজ্ঞাপন
সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা জাগ্রত করা।
আদায়ের সময় ও নিয়ম
ফিতরার সময় নিয়ে ফিকহবিদদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। মূলত তিনটি সময়ের কথা উল্লেখ করা যায়:
বিজ্ঞাপন
১. ওয়াজিব হওয়ার সময়
অধিকাংশ আলেমের মতে, ঈদুল ফিতরের দিন ফজরের সময় থেকে ফিতরা ওয়াজিব হয়। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈদের দিনের ফজরের সময় জীবিত এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তার উপর ফিতরা ওয়াজিব।
তবে কেউ যদি ঈদের আগের দিন সূর্যাস্তের পর মারা যান, তার উপর ফিতরা ওয়াজিব হবে না। আবার কেউ যদি ঈদের দিনের ফজরের পর জন্মগ্রহণ করে, তার পক্ষ থেকে ফিতরা ওয়াজিব হবে না।
বিজ্ঞাপন
২. আদায়ের উত্তম সময়
সুন্নাহ অনুযায়ী, ঈদের নামাজে যাওয়ার আগে ফিতরা আদায় করা উত্তম।
হাদিসে এসেছে,
বিজ্ঞাপন
রাসূলুল্লাহ ﷺ ঈদের নামাজের পূর্বে ফিতরা আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন।
এতে দুটি হিকমত রয়েছে—
দরিদ্ররা যেন ঈদের দিন অভাবগ্রস্ত না থাকে,
বিজ্ঞাপন
ঈদের আনন্দে সবাই অংশ নিতে পারে।
৩. অগ্রিম আদায়
অনেক সাহাবি রমজানের দুই-এক দিন আগে ফিতরা আদায় করতেন। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, রমজানের শুরু থেকেই ফিতরা আদায় করা বৈধ।
বিজ্ঞাপন
বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনেকেই রমজানের মাঝামাঝি বা শেষ দশকে ফিতরা দিয়ে থাকেন—যাতে দরিদ্ররা আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে পারে।
কোনো কারণে দেরিতে আদায় করলে কী হবে?
যদি কেউ ঈদের নামাজের পর ফিতরা আদায় করে, তাহলে তা আদায় হয়ে যাবে; তবে সুন্নাহর খেলাফ হবে।
বিজ্ঞাপন
আর যদি ঈদের দিনও না দেয় এবং বিলম্ব করে, তাহলে গুনাহগার হবে। তবুও তা তার উপর আদায় করা ফরজই থাকবে, যতদিন না আদায় করে।
কোন ব্যক্তির উপর ফিতরা ওয়াজিব?
১. মুসলিম হতে হবে।
বিজ্ঞাপন
২. নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হতে হবে (যা যাকাতের নেসাবের সমপরিমাণ, তবে এক বছর অতিক্রম শর্ত নয়)।
৩. নিজের ও নাবালক সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করতে হবে।
স্বামী স্ত্রীর পক্ষ থেকে আদায় করতে বাধ্য নন; তবে চাইলে দিতে পারেন।
ফিতরার পরিমাণ
হাদিসে শরীফে এসেছে এসেছে, এক ‘সা’ পরিমাণ খাদ্যশস্য ফিতরা হিসেবে নির্ধারিত। এক ‘সা’বলতে প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কেজির সমপরিমাণ।
প্রচলিত খাদ্যদ্রব্য যেমন
গম
যব
খেজুর
কিশমিশ
বর্তমানে অধিকাংশ দেশে এর সমমূল্য অর্থ প্রদান করা হয়। আলেমগণের মতে, দরিদ্রের কল্যাণে অর্থ প্রদান অধিক উপযোগী হলে তা জায়েজ।
ফিতরার সামাজিক ও আত্মিক প্রভাব
১. রোজার পরিশুদ্ধি
মানুষ হিসেবে আমরা রোজার সময় অনিচ্ছাকৃত ভুল করে থাকি। ফিতরাই সেই ভুলের কাফফারা স্বরূপ।
২. সামাজিক সাম্য
ইসলাম ধনী-দরিদ্র বৈষম্য কমাতে চায়। ঈদের দিন যেন কেউ অভুক্ত না থাকে—এটাই ফিতরার মূল উদ্দেশ্য।
৩. ভ্রাতৃত্বের বন্ধন
ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে সমাজে সহমর্মিতা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
ফিতরা প্রদানের সঠিক পদ্ধতি
১. স্থানীয় দরিদ্র ও মিসকিনদের অগ্রাধিকার দেওয়া।
২. বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রদান।
৩. ঈদের আগেই বিতরণ নিশ্চিত করা।
৪. নির্ধারিত পরিমাণের কম না দেওয়া।
গুরুত্বপূর্ণ কিছু মাসআলা
যদি পরিবারের কোনো সদস্য ঈদের আগের রাতে জন্ম নেয়, তার পক্ষ থেকেও ফিতরা দিতে হবে (ফজরের পূর্বে জন্ম হলে)।
গর্ভের সন্তানের পক্ষ থেখে ফিতরা-
গর্ভের সন্তানের পক্ষ থেকে ফিতরা দেওয়া ওয়াজিব নয়, তবে যদি কেউ দেয তাহলে নফল হিসেবে সওয়াব হবে।
কোনো ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি নেসাবের মালিক না হয়, তার উপর ফিতরা ওয়াজিব নয়।
আমাদের করণীয়
রমজানের শেষ দশকে আমরা যেভাবে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করি, তেমনি ফিতরা আদায়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়—ঈদের দিন নামাজ শেষে হঠাৎ মনে পড়ে ফিতরার কথা। এটি অনুচিত।
পরিকল্পিতভাবে—
আগেই হিসাব করা,
পরিবারের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণ,
নির্ধারিত হার অনুযায়ী অর্থ আলাদা রাখা,
ঈদের আগেই বিতরণ সম্পন্ন করা—
এগুলোই প্রকৃত মুত্তাকীদের কাজ।
ফিতরা একটি সামান্য দান নয়, এটি রমজানের পূর্ণতার প্রতীক। ঈদের দিনের আনন্দকে সর্বজনীন করার ইসলামী ব্যবস্থা।
আমরা যদি সুন্নাহ অনুযায়ী ঈদের নামাজের আগে ফিতরা আদায় করি, তাহলে তা হবে পরিপূর্ণ ইবাদত।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ফিতরা সঠিক সময় ও পদ্ধতিতে আদায়ের তাওফিক দিন এবং আমাদের রোজা, সালাত ও দান কবুল করুন।








