Logo

বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েও কেন খেলেনি ভারত?

profile picture
ক্রীড়া ডেস্ক
৮ জুন, ২০২৬, ২১:১৬
বিশ্বকাপের টিকিট পেয়েও কেন খেলেনি ভারত?
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে ভারতীয় ফুটবল বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নেবে—এমন স্বপ্ন কোটি সমর্থকের। তবে অনেকেই জানেন না, একসময় বিশ্বকাপের মঞ্চে খেলার বাস্তব সুযোগ পেয়েও শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়িয়েছিল ভারত। ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে এখনও স্মরণ করা হয় ১৯৫০ সালের সেই সিদ্ধান্তকে।

বিজ্ঞাপন

ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত ওই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছিল ভারত। এশিয়া অঞ্চলের বাছাইপর্বের জটিল সমীকরণে বিভিন্ন দল সরে দাঁড়ানো এবং অন্যান্য পরিস্থিতির কারণে ভারত বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাঠে নামা হয়নি ব্লু টাইগারদের।

আজও প্রশ্ন ওঠে—সেটি কি ছিল খালি পায়ে খেলার জেদ, নাকি আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফল?

বিশ্বমঞ্চে ওঠার সুবর্ণ সুযোগ

বিজ্ঞাপন

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফুটবল বিশ্বকাপ। সে সময় এশিয়া থেকে খুব কম দেশই আন্তর্জাতিক ফুটবলে সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন কারণে কয়েকটি দল অংশগ্রহণ থেকে সরে দাঁড়ানোয় ভারতের সামনে বিশ্বকাপে খেলার পথ উন্মুক্ত হয়ে যায়।

ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে অংশগ্রহণের সুযোগ পায় ভারত। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরুর আগেই দল প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় দেশের ফুটবল কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

খালি পায়ে খেলার গল্প

ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে ১৯৪৮ সালের লন্ডন অলিম্পিক একটি বিশেষ অধ্যায়। ওই আসরে ভারতীয় ফুটবলারদের অনেকেই বুট ছাড়া খেলেছিলেন। কারও পায়ে ছিল ব্যান্ডেজ, কেউ আবার খালি পায়েই মাঠে নেমেছিলেন।

বিশ্বজুড়ে সেই দৃশ্য আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। ফুটবলপ্রেমীরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখেছিলেন, আধুনিক সরঞ্জাম ছাড়াই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে একটি দল।

বিজ্ঞাপন

তবে বিশ্বকাপের মতো সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় বিষয়টিকে ভিন্নভাবে দেখেছিল বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও প্রতিযোগিতার মান নিশ্চিত করতে বুট পরে খেলা বাধ্যতামূলক করা হয়।

পরবর্তীকালে দীর্ঘদিন ধরে একটি জনপ্রিয় ধারণা প্রচলিত হয় যে, বুট পরে খেলতে অনাগ্রহী হওয়ায় ভারত বিশ্বকাপে যায়নি। যদিও ইতিহাসবিদদের অনেকে মনে করেন, বিষয়টি এতটা সরল ছিল না।

অর্থসংকট ও পরিকল্পনার অভাব

বিজ্ঞাপন

গবেষক এবং ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের বিশ্বকাপ না খেলার পেছনে বড় কারণ ছিল আর্থিক সীমাবদ্ধতা। সে সময় ব্রাজিলে পৌঁছানো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।

বর্তমানের মতো সরাসরি বিমান যোগাযোগ বা সহজ ভ্রমণব্যবস্থা তখন ছিল না। দীর্ঘ সমুদ্রপথে যাত্রা করতে হতো, যা ব্যয় ও সময়—দুই দিক থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

বিজ্ঞাপন

অল ইন্ডিয়া ফুটবল ফেডারেশনের পর্যাপ্ত অর্থায়ন, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ফলে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে দল পাঠানোর বিষয়ে শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।

অলিম্পিকের প্রতি বেশি গুরুত্ব

সে সময় ভারতীয় ক্রীড়া প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল ভিন্ন। ফুটবল বিশ্বকাপ আজ যতটা মর্যাদাপূর্ণ, তখন ভারতীয় ক্রীড়া মহলে অলিম্পিককে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো।

বিজ্ঞাপন

অনেক কর্মকর্তা মনে করতেন, অলিম্পিকে ভালো ফল অর্জন করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি।

ইতিহাসবিদদের মতে, এ সিদ্ধান্ত শুধু একটি টুর্নামেন্ট মিস করার ঘটনা ছিল না; বরং এটি ভারতীয় ফুটবলের ভবিষ্যৎ গতিপথেও বড় প্রভাব ফেলেছে।

ভারতীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় হারানো সুযোগ?

বিজ্ঞাপন

ভারত শেষ পর্যন্ত অংশগ্রহণ না করায় তাদের গ্রুপে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মাত্র তিনটি দল—ইতালি, সুইডেন ও প্যারাগুয়ে।

ফুটবল বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করলে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, বৈশ্বিক পরিচিতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভারত অনেক এগিয়ে যেতে পারত।

এ কারণেই ১৯৫০ সালের ঘটনাকে ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘হারানো সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। অনেকের মতে, সে সময়ের সিদ্ধান্ত ভিন্ন হলে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের চিত্রও আজ অন্যরকম হতে পারত।

বিজ্ঞাপন

যে বিশ্বকাপ ছিল ব্যতিক্রমী

১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ শুধু ভারতের অনুপস্থিতির জন্য নয়, টুর্নামেন্টের বিশেষ ফরম্যাটের কারণেও ইতিহাসে অনন্য।

ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে সেটিই ছিল একমাত্র আসর যেখানে প্রচলিত অর্থে কোনো ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। শেষ পর্যায়ে চারটি দলকে নিয়ে একটি বিশেষ রাউন্ড-রবিন পর্ব আয়োজন করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

এই পর্ব শেষে সর্বোচ্চ পয়েন্ট অর্জনকারী দলকে চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করার নিয়ম ছিল।

মারাকানায় ব্রাজিলের স্বপ্নভঙ্গ

সেই আসরের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে শেষ ম্যাচে। স্বাগতিক ব্রাজিল এবং উরুগুয়ের মধ্যকার ম্যাচটি কার্যত শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে পরিণত হয়।

ব্রাজিলের জন্য ড্র-ই যথেষ্ট ছিল। অন্যদিকে উরুগুয়েকে জিততেই হতো। ম্যাচে প্রথমে এগিয়ে যায় ব্রাজিল, আর তখন লাখো দর্শক শিরোপা উদযাপনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

কিন্তু ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয় উরুগুয়ে। দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে তারা ২-১ ব্যবধানে জয় তুলে নেয় এবং নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা নিশ্চিত করে।

মারাকানা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলের সেই পরাজয় ইতিহাসে ‘মারাকানাজো’ নামে পরিচিত হয়ে আছে—যা এখনও বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম স্মরণীয় ও বেদনাদায়ক অধ্যায়।

আজও রয়ে গেছে সেই প্রশ্ন

বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েও ভারত কেন যায়নি—এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে। কেউ দায় দেন খালি পায়ে খেলার ঐতিহ্যকে, কেউ আর্থিক দুর্বলতা ও প্রশাসনিক অদূরদর্শিতাকে।

তবে একটি বিষয়ে প্রায় সবাই একমত—১৯৫০ সালের সেই সিদ্ধান্ত ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোর একটি। আর সেই হারানো সুযোগের গল্প আজও ফুটবলপ্রেমীদের কৌতূহল জাগিয়ে রাখে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD