আর্জেন্টিনার তিন শিরোপা : গৌরব নাকি বিশ্বকাপের কলঙ্ক?

বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই গৌরব, আবেগ, স্বপ্নপূরণ আর ইতিহাস রচনার মঞ্চ। কিন্তু ফুটবলের সর্বোচ্চ এই আসরের কিছু অধ্যায় শুধু সাফল্যের জন্য নয়, বরং বিতর্ক, প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে। আর সেই আলোচনার কেন্দ্রে বারবার উঠে এসেছে আর্জেন্টিনার নাম।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৮, ১৯৮৬ এবং ২০২২—আর্জেন্টিনার তিনটি বিশ্বকাপ জয়কে ঘিরে আজও বিতর্ক থামেনি। সমর্থকদের কাছে এগুলো বীরত্বগাঁথা হলেও সমালোচকদের চোখে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ও প্রশ্নবিদ্ধ অধ্যায়গুলোর মধ্যে অন্যতম।
১৯৭৮: সামরিক শাসনের ছায়ায় প্রথম বিশ্বজয়
১৯৭৮ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করে আর্জেন্টিনা। সে সময় দেশটি ছিল সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচিত ছিল সরকার।
বিজ্ঞাপন
এমন পরিস্থিতিতে আয়োজিত বিশ্বকাপকে অনেকেই সামরিক সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন। টুর্নামেন্টজুড়েই স্বাগতিকদের প্রতি বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় দ্বিতীয় রাউন্ডে পেরুর বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ৬-০ গোলের জয় নিয়ে। ফাইনালে ওঠার জন্য বড় ব্যবধানে জয় প্রয়োজন ছিল আর্জেন্টিনার, আর ঠিক সেই ফলই আসে। প্রায় পাঁচ দশক পরও ম্যাচটি নিয়ে প্রশ্নের শেষ হয়নি।
বিজ্ঞাপন
ফাইনালে নেদারল্যান্ডসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে আর্জেন্টিনা। কিন্তু ডাচ খেলোয়াড়দের একাংশ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান বর্জন করে স্বাগতিকদের প্রতি পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তোলে।
ফুটবলের রেকর্ড বইয়ে এটি আর্জেন্টিনার প্রথম বিশ্বজয় হলেও ইতিহাসের আরেক পাতায় ১৯৭৮ বিশ্বকাপ আজও রাজনৈতিক প্রভাব ও বিতর্কের প্রতীক হয়ে আছে।
১৯৮৬: ‘ঈশ্বরের হাত’ নাকি প্রকাশ্য প্রতারণা
বিজ্ঞাপন
মেক্সিকো বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে দ্বিতীয় শিরোপা এনে দেয়। কিন্তু সেই বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ডিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল।
ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনের আগেই হাতে বল স্পর্শ করে জালে পাঠান ম্যারাডোনা। রেফারির চোখ এড়িয়ে গোলটি বৈধতা পায়। পরে ম্যারাডোনা এটিকে আখ্যা দেন ‘ঈশ্বরের হাতের গোল’ হিসেবে।
বিজ্ঞাপন
অনেকের কাছে এটি ফুটবল প্রতিভার অংশ নয়, বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রেফারিং ভুল। বিশেষ করে ফকল্যান্ড যুদ্ধের পর এই গোলকে আর্জেন্টিনার প্রতীকী প্রতিশোধ হিসেবে দেখানো হলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়।
যদিও একই ম্যাচে ম্যারাডোনার করা দ্বিতীয় গোলটি ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, তবু ‘হ্যান্ড অব গড’ আজও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্তগুলোর একটি।
২০২২: মেসির বিশ্বকাপ নাকি পেনাল্টির বিশ্বকাপ
বিজ্ঞাপন
কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর লিওনেল মেসি বিশ্বকাপ জেতায় কোটি সমর্থক আনন্দে ভাসলেও পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে পেনাল্টি নিয়ে বিতর্ক ছিল তুঙ্গে।
টাইব্রেকার বাদ দিয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৫টি পেনাল্টি, যা এক বিশ্বকাপে কোনো দলের জন্য রেকর্ড। এর মধ্যে ৪টি থেকে গোল করেন মেসি।
বিশেষ করে পোল্যান্ড ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পাওয়া পেনাল্টিগুলো নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষক এগুলোকে ‘সফট’ সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেন।
বিজ্ঞাপন
নেদারল্যান্ডসের সাবেক কোচ লুই ফন গাল প্রকাশ্যে অভিযোগ করেন, মেসিকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন করার জন্য আর্জেন্টিনা সুবিধা পেয়েছে এবং পুরো টুর্নামেন্ট সাজানো ছিল। যদিও ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশঁসহ অনেকেই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্সের প্রশংসা করেন।
ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনা নিঃসন্দেহে অন্যতম সফল দল। বিশ্বকাপ জয়ের কৃতিত্ব তাদের অর্জনের অংশ। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনটি বিশ্বজয়ের মধ্যে অন্তত তিনটি বিশ্বকাপই কোনো না কোনো বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৮ সালে সামরিক সরকারের ছায়া, ১৯৮৬ সালে ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং ২০২২ সালে পেনাল্টি বিতর্ক—প্রতিবারই শিরোপার পাশাপাশি প্রশ্নও উঠে এসেছে।সমর্থকদের কাছে এগুলো ফুটবল মহাকাব্যের অধ্যায়। সমালোচকদের কাছে এগুলো এমন কিছু ঘটনা, যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে আর্জেন্টিনার সাফল্যের পাশে চিরকাল বিতর্কের একটি তারকা চিহ্ন হয়ে থাকবে।








