বিশ্বকাপ ‘বিক্রির’ প্রতিবাদে ফিফা বয়কটের ঘোষণা উয়েফার

বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মালিকানা ও আয়ের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক ফুটবলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করে ইউরোপীয় ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফা ফিফার সব ধরনের প্রতিযোগিতা বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) অনুষ্ঠিত এক ভোটাভুটিতে উয়েফার ৫৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা সর্বসম্মতিক্রমে ফিফার বিতর্কিত পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেন।
সংস্থাটির ভাষ্য, বিশ্বকাপের মতো ঐতিহাসিক ও মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টকে কোনোভাবেই বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত করা উচিত নয় এবং এর মালিকানা বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণযোগ্য নয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
উয়েফা জানিয়েছে, যতদিন ফিফা এই পরিকল্পনা থেকে সরে না আসে, ততদিন তাদের সদস্যভুক্ত জাতীয় দলগুলো ফিফার অধীন কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে না। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপ বা ফিফার অন্য কোনো প্রতিযোগিতার মালিকানা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে না—এমন আইনি নিশ্চয়তাও তারা দাবি করেছে।
বিজ্ঞাপন
এক বিবৃতিতে উয়েফা বলেছে, বিশ্বকাপ শুধু একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট নয়, এটি বিশ্ব ক্রীড়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। তাই এটিকে কেনাবেচার সম্পদে পরিণত করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
এদিকে ইউরোপের পাশাপাশি এশীয় ফুটবল মহলেও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের (এএফসি) সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা সদস্য দেশগুলোর উদ্দেশে পাঠানো এক বার্তায় বলেন, ফিফার এই উদ্যোগ মহাদেশভিত্তিক ফুটবল কাঠামোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাঁর মতে, এমন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব কনফেডারেশনের মতামত নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
জানা গেছে, ফিফার আলোচিত প্রকল্পটি নিউইয়র্কভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ইটারনাল–এর মাধ্যমে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা জোশুয়া কুশনার, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের ভাই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে ফিফার উচ্চপর্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ (এফএফই) গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে প্রায় ৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার বেসরকারি মূলধন যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ থেকে সম্ভাব্য বিপুল আয়ের বিষয়টিকে সামনে রেখেই এই পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ইউরোপের ৫৫টি এবং এশিয়ার ৪৬টি সদস্য দেশ মিলিয়ে ফিফার মোট সদস্যের প্রায় অর্ধেকের প্রতিনিধিত্ব করে। ফলে এই দুই অঞ্চলের বিরোধিতা ফিফার জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফও সম্প্রতি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রকল্পটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি বলেছে, এত বড় পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছতা ও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো সদস্য দেশগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে নতুন কাঠামোতে যুক্ত হলে আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছেন। সেখানে আগামী চার বছরের জন্য সদস্য দেশগুলোর মৌলিক অনুদান ১০ মিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ মিলিয়ন ডলার করার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৮ সাল পর্যন্ত মোট অর্থায়নের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
তবে আর্থিক প্রণোদনার এই প্রস্তাবও ইউরোপীয় ফুটবল কর্তৃপক্ষের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারেনি। উয়েফা স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও বিশ্বকাপের ঐতিহ্য রক্ষার প্রশ্নে তারা আপস করবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, উয়েফার বয়কটের ঘোষণার পাশাপাশি এশিয়া ও অন্য কনফেডারেশনগুলোর উদ্বেগ ফিফার জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক ও সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। ফলে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসরকে ঘিরে এই বিরোধ আগামী দিনে আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।








