Logo

ঐতিহ্যের চাকায় জীবিকা, যান্ত্রিক যুগেও টিকে আছে ঘোড়ার গাড়ি

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শেরপুর, বগুড়া
২৫ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪৪
ঐতিহ্যের চাকায় জীবিকা, যান্ত্রিক যুগেও টিকে আছে ঘোড়ার গাড়ি
ছবি: প্রতিনিধি

যান্ত্রিকতার দাপটে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ পরিবহনব্যবস্থা। বগুড়া শেরপুর উপজেলার কিছু এলাকায় এখনো আলু পরিবহনের প্রধান ভরসা ঘোড়ার গাড়ি। শত বছরের এই পদ্ধতিকে আঁকড়ে ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক মানুষ। কাদামাটি আর ভাঙাচোরা পথই তাঁদের কর্মক্ষেত্র।

বিজ্ঞাপন

কুসুম্বী ইউনিয়ন-এর তিলকাতলা এলাকায় ভদ্রা নদী পাড়ে গিয়ে দেখা যায়, আলু তোলার মৌসুমে জমে উঠেছে ব্যস্ততা। মাঠ থেকে তোলা আলুর বস্তা সারিবদ্ধভাবে তোলা হচ্ছে ঘোড়ার গাড়িতে। কাদা-পানির পথ পেরিয়ে এসব আলু পৌঁছাচ্ছে পাকা সড়কে, সেখান থেকে ট্রাকে করে যাচ্ছে হিমাগার কিংবা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বোর্ডেরহাট এলাকাতেও একই দৃশ্য চোখে পড়ে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অন্তত ছয় থেকে সাত বছর ধরে সংগঠিতভাবে কয়েকটি দল এ কাজে যুক্ত রয়েছে। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রায় সাতটি ঘোড়ার গাড়ির দল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

রাশেদ নামের এক শ্রমিক জানান, তিনি দুই বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। একটি ঘোড়ার গাড়িতে ১৫ থেকে ১৬ মণ আলু বহন করা যায়। প্রতি ৬৫ কেজির বস্তা পরিবহনে তারা পান ৬০ টাকা। পুরো মৌসুমে তাঁর আয় দাঁড়ায় প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, যা দিয়েই পরিবার চালান তিনি।

এই পেশার সঙ্গে যুক্তদের অনেকেই স্থানীয় নন। মৌসুম এলে আশপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা এখানে এসে জড়ো হন। সিংড়া উপজেলা, চাটমোহর উপজেলা, ভাঙ্গুড়া উপজেলা, ধুনট উপজেলা, উল্লাপাড়া উপজেলা ও কাজিপুর উপজেলা থেকে দল বেঁধে শ্রমিকরা এ কাজে অংশ নেন।

শ্রমিক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন রয়েছে। আগে ধান মাড়াইয়ে ব্যবহৃত হলেও এখন আলু পরিবহনেই বেশি ব্যবহার হচ্ছে। তবে ট্রাক ও আধুনিক যানবাহনের ব্যবহারের কারণে এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বাস্তবতায় ঘোড়ার গাড়ির কিছু বিশেষ সুবিধাও রয়েছে। কাদা বা পানিপূর্ণ জমিতে যেখানে ট্রাক বা অন্য যান চলাচল করতে পারে না, সেখানে সহজেই চলতে পারে এই গাড়ি। কম খরচ হওয়ায় কৃষকরাও এখনো এ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি সাইকেলেও আলু বহনের প্রচলন রয়েছে।

শ্রমিকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি দল মৌসুমে প্রায় ৫০ হাজার বস্তা আলু পরিবহন করে। একটি ঘোড়ার পেছনে প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হলেও কম খরচ ও কাজের সুযোগ থাকায় তারা এই পেশা ধরে রেখেছেন।

অন্যদিকে, আলুর বাজার পরিস্থিতি নিয়েও রয়েছে অনিশ্চয়তা। মৌসুমের শুরুতে মাঠ থেকেই আলু বিক্রি হয়েছে মাত্র ৬ টাকা কেজি দরে, যা বর্তমানে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ থেকে ১৩ টাকায়। এতে কিছুটা স্বস্তি এলেও কৃষকদের অভিযোগ, লাভের বড় অংশ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।

বিজ্ঞাপন

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ২ হাজার ৭৮০ হেক্টরে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫০ হাজার মেট্রিক টন। উপজেলায় পাঁচটি হিমাগারে মোট ৩৩ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি অনেক কৃষক স্থানীয় পদ্ধতিতেও আলু সংরক্ষণ করছেন।

গ্রামীণ অর্থনীতির এই চিত্রে ঘোড়ার গাড়ি একদিকে ঐতিহ্যের প্রতীক, অন্যদিকে বহু মানুষের জীবিকার প্রধান ভরসা। তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এই পেশা টিকে থাকবে কি না—সেই প্রশ্নই এখন ভাবাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD