Logo

আল মুসলিম গ্রুপের তিন কারখানায় চাকরি হারালেন ১৮৬৮ শ্রমিক

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
সাভার, ঢাকা
৬ জুন, ২০২৬, ১৫:১২
আল মুসলিম গ্রুপের তিন কারখানায় চাকরি হারালেন ১৮৬৮ শ্রমিক
ছবি: সংগৃহীত

ব্যবসায়িক মন্দা ও উৎপাদন আদেশ কমে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে সাভারে অবস্থিত আল মুসলিম গ্রুপের তিনটি পোশাক কারখানা থেকে এক হাজার ৮৬৮ শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। হঠাৎ চাকরি হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন বিপুল সংখ্যক শ্রমিক। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেক কর্মী, যারা দাবি করছেন ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় শ্রম আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (৬ জুন) সকালে সাভারের উলাইল ও রেডিও কলোনি এলাকার সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর সামনে গিয়ে দেখা যায়, চাকরিচ্যুত অনেক শ্রমিক কারখানার গেটে এবং আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছেন। কেউ তালিকায় নিজের নাম খুঁজছেন, আবার কেউ সহকর্মীদের সঙ্গে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছেন।

কারখানা সূত্রে জানা গেছে, উলাইল এলাকার একেএম নিটওয়্যার লিমিটেড থেকে সর্বাধিক এক হাজার ২৮৬ জন শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। এছাড়া রেডিও কলোনি এলাকার প্যাসিফিক ব্লু জিন্স ওয়ার থেকে ৫২৯ জন এবং আশুলিয়ার আল-মুসলিম অ্যাপারেলস থেকে আরও ৫৩ জন কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

আল মুসলিম গ্রুপের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. আবু রায়হান বলেন, বৈশ্বিক বাজারে পোশাক খাতের চাহিদা কমে যাওয়া এবং নতুন ক্রয়াদেশ হ্রাস পাওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানটি শ্রম আইন অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

তিনি জানান, বাংলাদেশ শ্রম আইন-২০০৬ এর ২০ ধারার আওতায় শ্রমিক ছাঁটাই করা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের সব ধরনের পাওনা ও বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে।

তবে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। তাদের অভিযোগ, কোনো ধরনের পূর্বঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ করে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। অনেকেই দাবি করেছেন, ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর ফিরে এসে জানতে পারেন তারা আর কর্মরত নন।

বিজ্ঞাপন

একেএম নিটওয়্যারের সুইং সেকশনের কর্মী সাব্বির হোসেন বলেন, ঈদের আগে সীমিত সময়ের বেতন পরিশোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ছাঁটাইয়ের বিষয়ে কোনো লিখিত বা মৌখিক নোটিশ দেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, একদিকে নিয়মিত অতিরিক্ত সময় কাজ করানো হয়েছে, অন্যদিকে এখন বলা হচ্ছে কাজের অভাব রয়েছে।

আরেক শ্রমিক নাজমা আক্তার জানান, তিনি প্রায় তিন বছর ধরে হেলপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ঈদের ছুটি কাটিয়ে কাজে যোগ দিতে এসে কারখানার প্রবেশপথেই জানতে পারেন তার চাকরি নেই। তার দাবি, কর্তৃপক্ষ তাকে মোবাইল ফোনে পাঠানো বার্তা দেখার কথা বললেও পরে তিনি কোনো বার্তা পাননি।

এদিকে শ্রমিক ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, শ্রম আইন অনুযায়ী ছাঁটাইয়ের ক্ষমতা মালিকপক্ষের থাকলেও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজন হলে পুনর্নিয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়নি। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হলে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অন্তত কিছুটা নিশ্চয়তা তৈরি হতো।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ গার্মেন্ট ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

তিনি বলেন, অধিকাংশ খাতে দীর্ঘদিন কাজ করলে কর্মীরা অভিজ্ঞ ও দক্ষ হয়ে ওঠেন এবং তাদের চাকরির নিরাপত্তাও বাড়ে। কিন্তু পোশাক খাতে অনেক সময় উল্টো চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে যেসব শ্রমিকের বেতন ধাপে ধাপে বৃদ্ধি পায় কিংবা গ্রেড উন্নীত হয়, তাদের অনেককে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিতে পড়তে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শ্রমিক সংগঠনের নেতারা আরও বলেন, বর্তমানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক বাজারের কারণে বিভিন্ন কারখানা চাপের মধ্যে রয়েছে। তবে সেই চাপের পুরো বোঝা শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দিলে হাজারো পরিবারের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে।

ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের অনেকেই এখন নতুন চাকরির সন্ধানে রয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, একসঙ্গে এত সংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়ায় নতুন কর্মসংস্থান পাওয়া সহজ হবে না। বিশেষ করে যাদের পরিবার সম্পূর্ণভাবে গার্মেন্টস খাতের আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

এদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ ও কারখানা কর্তৃপক্ষের অবস্থান নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। শ্রম আইন অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং ভবিষ্যতে ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের পুনর্নিয়োগ বা বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে কি না, সে বিষয়েও নজর রাখছেন শ্রম অধিকারকর্মীরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD