আকাশপথে যুক্ত হচ্ছে বগুড়া, বদলে যাবে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি

উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত বগুড়া বিমানবন্দরকে পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমানবন্দরে রূপ দিতে ব্যাপক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দরটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রানওয়ে সম্প্রসারণ, আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি স্থাপনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ খাতে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে।
বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় একটি পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি রানওয়ে সম্প্রসারণ, পেভমেন্ট ডিজাইন, টার্মিনাল ভবনের নকশা এবং অন্যান্য কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-কে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান অবকাঠামোকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে একাধিক ধাপে কাজ করা হবে। এতে শুধু বিমান চলাচলের সুবিধাই বাড়বে না, বরং অঞ্চলটির সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: ছেলের চোখের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা
বিমানবন্দরটি চালু হলে শুধু বগুড়াই নয়, জয়পুরহাট, নওগাঁ, গাইবান্ধা, রাজশাহী এবং সিরাজগঞ্জসহ আশপাশের জেলার মানুষও সরাসরি সুবিধা পাবেন। বিশেষ করে কৃষিপ্রধান এ অঞ্চলের উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের জন্য এটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত হলে কৃষিপণ্য, সবজি, ফলমূল এবং কৃষিযন্ত্রপাতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজে পৌঁছানো যাবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রও সম্প্রসারিত হবে।
বিজ্ঞাপন
বগুড়া শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় অবস্থিত বিমানবন্দরটির ইতিহাস বেশ পুরোনো। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ মেয়াদে বগুড়াকে মডেল জেলা হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
সে সময় প্রায় ১০৯ একরের বেশি জমি অধিগ্রহণ করে রানওয়ে, প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক স্থাপনা এবং অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করা সম্ভব হয়নি।
পরে ২০০৬ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান এখানে কার্যক্রম শুরু করে। এরপর থেকে বিমানবন্দরটি মূলত সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে বিমানবন্দরের রানওয়ের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ হাজার ৫০০ ফুট। তবে বাণিজ্যিক ও বড় আকারের বিমান পরিচালনার জন্য এটি যথেষ্ট নয়।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় রানওয়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ১০ হাজার ফুট করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন ট্যাক্সিওয়ে, এপ্রোন, আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নেভিগেশন প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক মানের লাইটিং সিস্টেম স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া বিমানবন্দরকে ঘিরে প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো যেমন—সংযোগ সড়ক, পার্কিং জোন, অভ্যন্তরীণ সড়ক এবং অন্যান্য সেবামূলক স্থাপনাও নির্মাণ করা হবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে বিভিন্ন কারিগরি ও পরিবেশগত মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ভূ-প্রকৌশল জরিপ, মৃত্তিকা পরীক্ষা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব সমীক্ষার ভিত্তিতেই প্রকল্পের চূড়ান্ত নকশা ও বাস্তবায়ন কৌশল নির্ধারণ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, বিমানবন্দর চালু হলে এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে। এরুলিয়া এলাকার বাসিন্দা আমিনুর ইসলাম বলেন, বিমানবন্দর ঘিরে নতুন ব্যবসা, সেবা প্রতিষ্ঠান এবং পর্যটন খাতের বিকাশ ঘটবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।
তবে স্থানীয় উদ্যোক্তা সেলিম সরকার সতর্ক আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, অতীতেও বিমানবন্দর চালুর নানা ঘোষণা এসেছে। তাই এবার মানুষ শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তব কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখতে চায়।
বগুড়া চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি এবং উদ্যোক্তা মো. সাইরুল ইসলাম বলেন, বগুড়া উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ কৃষি উৎপাদন কেন্দ্র। বিমানবন্দর চালু হলে কৃষকরা দ্রুত তাদের পণ্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং বিদেশে পাঠাতে পারবেন।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, এতে কৃষিপণ্যের অপচয় কমবে, বাজার সম্প্রসারিত হবে এবং কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীরা দ্রুত আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন।
গত ৭ মে বিমানবন্দর এলাকা পরিদর্শন করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এবং বিমান বাহিনীর প্রধান। পরিদর্শন শেষে উপদেষ্টা আফরোজা খানম জানান, উত্তরবঙ্গের প্রথম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বগুড়ায় নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে একটি ফ্লাইং একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং পুরো অঞ্চলকে একটি অ্যাভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা হচ্ছে।
বগুড়া বিসিক জেলা কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক এ কে এম মাহফুজুর রহমান বলেন, বিমানবন্দর চালু হলে স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন।
তার মতে, বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ক্রেতারা সরাসরি বগুড়ায় আসতে পারবেন, যা শিল্পায়ন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও সহজ হবে।
বিজ্ঞাপন
বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, বিমানবন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের প্রাথমিক কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অল্প সময়ের মধ্যেই প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে এবং বহু বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বগুড়ার মানুষের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেবে।








