Logo

ভরা মৌসুমেও মেঘনায় ইলিশের দেখা নেই, দুশ্চিন্তায় জেলেরা

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
রামগতি, লক্ষ্মীপুর
২৮ জুলাই, ২০২৬, ১৫:৪৬
ভরা মৌসুমেও মেঘনায় ইলিশের দেখা নেই, দুশ্চিন্তায় জেলেরা
ছবি: প্রতিনিধি

ইলিশের ভরা মৌসুমেও চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলেকজান্ডার পর্যন্ত প্রায় ১০০ কিলোমিটার মেঘনা নদীতে দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশের।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবছর জুলাই মাসে যে নদীপথ জেলেদের কর্মচাঞ্চল্য, মাছ ধরার নৌকার সারি এবং ইলিশের বেচাকেনায় মুখর হয়ে ওঠে, এবার সেখানে অনেকটাই নীরবতা। পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন জেলে, আড়তদার ও মাছ ব্যবসায়ীরা। অনেক জেলেকেই এখন নদীতে না গিয়ে বেকার সময় কাটাতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বছরের এ সময়ে মেঘনায় ইলিশের ব্যাপক উপস্থিতি থাকার কথা। নদীতে শত শত মাছ ধরার নৌকা ছুটে বেড়ানোর পাশাপাশি বিভিন্ন মাছঘাটে ইলিশের বেচাকেনা জমজমাট হয়ে ওঠে। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। দিন-রাত নদীতে জাল ফেলেও জেলেদের জালে আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়ছে না। এতে নৌকার জ্বালানি, শ্রমিক ও অন্যান্য খরচ তুলতে না পেরে অনেকেই লোকসানের মুখে পড়ছেন।

ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে বিভিন্ন কারণের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে জাটকা সংরক্ষণে গত ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়াকে দায়ী করছেন কেউ কেউ। তাদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় নদীতে কার্যকর নজরদারি ও অভিযান না থাকায় অবাধে জাটকা নিধন হয়েছে। এর ফলে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজনন ও উৎপাদন ব্যাহত হয়ে থাকতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সরকার প্রতি বছর জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে দেশের নির্ধারিত ইলিশ অভয়াশ্রমগুলোতে দুই মাস মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এ সময় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন ও মজুত নিষিদ্ধ থাকে। লক্ষ্মীপুরের রামগতির চর আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের ষাটনল পর্যন্ত মেঘনার প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে নিবন্ধিত জেলেদের জীবিকা নির্বাহে প্রতি মাসে ৪০ কেজি করে ভিজিএফ চাল দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় জাটকা সংরক্ষণের উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। এ কারণে ভরা মৌসুমে ইলিশের সংকট দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন তারা। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের সঙ্গে একমত না হয়ে নদীতে জেগে ওঠা ডুবোচরকে ইলিশের গতিপথ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কমলনগর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা তূর্য সাহা বলেন, মেঘনা নদীর মাঝামাঝি এলাকায় নতুন করে ডুবোচর জেগে ওঠায় আগের মতো ওই অঞ্চলে ইলিশ আসতে পারছে না। ফলে মাছের প্রাপ্যতা কমে গেছে।

মাতাব্বরহাট মাছঘাটের এক আড়তদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ে এ বছর নদীতে কার্যকর অভিযান তেমন দেখা যায়নি। অবাধে জাটকা ধরা হয়ে থাকলে সেটিও ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণ হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

জেলেরা জানান, নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় তাদের আয়-রোজগার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। অনেক সময় সারাদিন নদীতে জাল ফেলেও যে পরিমাণ মাছ পাওয়া যায়, তা দিয়ে নৌকার জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচই ওঠে না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেক জেলে বেকার সময় কাটাচ্ছেন। অন্যদিকে বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় যে অল্পসংখ্যক মাছ উঠছে, সেগুলোর দামও সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

লক্ষ্মীপুর জেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, মেঘনার মাঝনদীতে জেগে ওঠা ডুবোচরের কারণে এ অঞ্চলে ইলিশের উৎপাদন কমে থাকতে পারে। তবে জাটকা সংরক্ষণকালীন অবাধে মাছ ধরার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ওই সময়ে তিনি দায়িত্বে ছিলেন না, তাই এ বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এদিকে ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ দল। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমানের নেতৃত্বে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (সিইজিআইএস) বিশেষজ্ঞরা এ কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। জানা গেছে, তারা ইতোমধ্যে জেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করে তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমান বলেন, মৎস্যসম্পদ রক্ষায় সরকারের নেওয়া অভিযান যথাযথভাবে বাস্তবায়িত না হলে পরবর্তী সময়ে ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি নদীতে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডও ইলিশের বিচরণ ও উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, সময়মতো বৃষ্টিপাত না হওয়া, সাগর থেকে নোনাজলের প্রবেশসহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন পরিবর্তনের কারণেও ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের এই অনুসন্ধানে ইলিশের সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হবে এবং ভবিষ্যতে মেঘনা নদীতে ইলিশের উৎপাদন ও জেলেদের জীবিকা স্বাভাবিক রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীদের।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD