প্রেমের টানে চীন থেকে বাংলাদেশে, তবে খালি হাতে ফিরলেন যুবক

প্রেমিকার সঙ্গে সংসার বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে চীন থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন এক যুবক। দীর্ঘদিনের অনলাইন পরিচয় ও প্রেমের সম্পর্ককে বাস্তবে রূপ দিতে তার এই সফর। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব পরিকল্পনা থমকে যায় বয়সসংক্রান্ত আইনি জটিলতায়। প্রেমিকার বয়স প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়ায় বিয়ে সম্ভব হয়নি, ফলে প্রত্যাশা অপূর্ণ রেখেই নিজ দেশে ফিরে যেতে হয়েছে ওই চীনা নাগরিককে।
বিজ্ঞাপন
ঘটনাটি কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চাপড়া ইউনিয়নের উত্তর পার সাঁওতা গ্রামে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের কাছে এমন ঘটনা ছিল একেবারেই ব্যতিক্রমী। ফলে বিদেশি ওই যুবককে একনজর দেখতে কৌতূহলী মানুষের ভিড়ও লক্ষ্য করা যায়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চীনের নাগরিক এম এ হাইশান (৩৯) এবং কুমারখালীর বাসিন্দা রিয়া আক্তারের (১৬) মধ্যে প্রায় আট মাস আগে একটি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে পরিচয় হয়। শুরুতে সাধারণ বন্ধুত্ব থাকলেও সময়ের সঙ্গে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে এবং পরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
আরও পড়ুন: দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ
বিজ্ঞাপন
অনলাইন যোগাযোগের এই সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিক পরিণতি দিতে বুধবার সকালে বাংলাদেশে আসেন হাইশান। রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর রিয়া এবং তার পরিবারের সদস্যরা তাকে গ্রহণ করেন। পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কুমারখালীর গ্রামের বাড়িতে।
তবে বিয়ের বিষয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর সামনে আসে বড় বাধা। রিয়ার বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় পরিবারের সদস্য, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে আপত্তি জানানো হয়। বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের বিয়ে বৈধ নয়। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শেষ পর্যন্ত বিয়ের পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
রিয়া আক্তার জানান, দীর্ঘদিনের পরিচয় থেকে তাদের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। হাইশান বিয়ের উদ্দেশ্যেই বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু বয়সজনিত কারণে এখন সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বিষয়টি আবার বিবেচনা করা হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে রিয়ার পরিবারও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। মেয়ের মা জানিয়েছেন, বয়স কম থাকায় তারা কোনোভাবেই বিয়েতে সম্মতি দেননি। পরিবারের সিদ্ধান্ত হলো, আইনগত বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে মেয়ের বিয়ে দেওয়া হবে না।
চীনা নাগরিক হাইশান ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কারণে মোবাইল অ্যাপের অনুবাদ ব্যবহার করে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিয়ের আশা নিয়েই বাংলাদেশে এসেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবুও তিনি হতাশ নন এবং ভবিষ্যতের জন্য অপেক্ষা করতে প্রস্তুত। তার ভাষায়, প্রয়োজন হলে তিনি আরও দেড় বছর অপেক্ষা করবেন।
ঘটনাটি দ্রুতই পুরো এলাকায় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, তাদের এলাকায় এর আগে বিদেশ থেকে কোনো ব্যক্তি প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে বিয়ের উদ্দেশ্যে এসেছেন—এমন ঘটনা তারা দেখেননি। ফলে গ্রামের মানুষদের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়।
বিজ্ঞাপন
চাপড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এনামুল হক মনজু বলেন, চীনা নাগরিকের আগমনের খবর পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হয়। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সার্বিক পরিস্থিতির দিকে নজর রাখেন। তিনি জানান, মেয়েটি এখনও এসএসসি পরীক্ষার্থী এবং বয়সও কম। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পরিবার বিয়ের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। পরে প্রশাসনের সহায়তায় ওই যুবককে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করা হয়।
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার বলেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরদারিতে ছিল। মেয়েটির বয়স কম হওয়ায় পরিবারকে আইনগত বিষয়গুলো বুঝিয়ে বলা হয়েছে। পরিবারও বিয়ের বিষয়ে সম্মতি দেয়নি। পরবর্তীতে চীনা নাগরিক নিজ দেশে ফিরে গেছেন।
বিজ্ঞাপন
আইনগত বাধার কারণে বিয়ে না হলেও এই ঘটনা স্থানীয়ভাবে বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এলাকাজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল চীন থেকে আসা ওই যুবকের প্রেমের গল্প। তবে সবকিছুর শেষে আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে বিয়ের পরিকল্পনা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তই নিয়েছে উভয় পক্ষ। এখন অপেক্ষা—ভবিষ্যতে এই সম্পর্ক আদৌ নতুন কোনো পরিণতি পায় কি না।








