Logo

নামকরণেই থমকে আছে ‘জিয়া হল কমপ্লেক্স’

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
খুলনা
১৭ জুন, ২০২৬, ১৭:৫৮
নামকরণেই থমকে আছে ‘জিয়া হল কমপ্লেক্স’
ছবি: সংগৃহীত

খুলনার শিববাড়ি মোড়ে একসময় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল ‘জিয়া হল’। নব্বইয়ের দশকে নগরবাসীর কাছে অত্যন্ত পরিচিত এই স্থাপনাটি সময়ের পরিক্রমায় নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের কারণে একাধিকবার নাম পরিবর্তনের মুখে পড়ে।পরবর্তীতে ভবনটি জরাজীর্ণ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলা হলেও সেই স্থানে আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা এখনও বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রকল্পটির নামকরণ নিয়ে চূড়ান্ত অনুমোদন না মেলায় কার্যক্রম এগোতে পারছে না।

খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) নথিপত্র অনুযায়ী, ১৯৯২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া শিববাড়ি মোড়ে নির্মিত জিয়া হলের উদ্বোধন করেন। দীর্ঘদিন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সভা-সমাবেশ ও সামাজিক আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।

ভবনটির অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ২০১৩ সালে একটি কনডেমনেশন কমিটি গঠন করা হয়। পরে মূল্য নির্ধারণসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে তা অপসারণের জন্য একাধিকবার নিলাম আহ্বান করা হয়। তবে কয়েক দফা নিলাম বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও কোনো প্রতিষ্ঠান আগ্রহ না দেখানোয় প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়।

বিজ্ঞাপন

অবশেষে ২০২১ সালে সৌরভ এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ভবনের ভগ্নাবশেষ ক্রয়ের আবেদন করে। পরবর্তীতে সেই আবেদন অনুমোদিত হলে পুরোনো জিয়া হল ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়। এরপর সেখানে আধুনিক সিটি সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ‘জিয়া হল কমপ্লেক্স’ নামে নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘খুলনা জিয়া হল কমপ্লেক্স’ নামটি চূড়ান্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে কেসিসি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। প্রায় এক মাস আগে নাম ব্যবহারের অনুমতি চেয়ে ‘জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন’-এর কাছেও চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।

বিজ্ঞাপন

কেসিসি সূত্র জানায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে নামকরণ অনুমোদনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি শর্ত পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রকল্প ব্যয়ের ৩০ শতাংশ নিজস্ব অর্থায়ন নিশ্চিত করা, উন্নয়ন ব্যয়ের পুনর্মূল্যায়ন, অবকাঠামোগত প্রয়োজনীয়তা যাচাই এবং উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনর্গঠন।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় একটি নয়তলা আধুনিক কমপ্লেক্স নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ সড়ক ও ড্রেন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা স্থাপন, যানবাহন ক্রয় এবং সৌরবিদ্যুৎ সংযোজনের কথাও ভাবা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে খুলনায় আধুনিক কনভেনশন সেন্টার, সেমিনার হল ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খুলনার বাসিন্দাদের অনেকেই মনে করেন, জিয়া হল শুধুমাত্র একটি ভবনের নাম নয়; এটি নগরীর সাংস্কৃতিক স্মৃতির অংশ। সোনাডাঙ্গা এলাকার বাসিন্দা খান একরামুল হক বলেন, ছোটবেলায় বিভিন্ন জাতীয় দিবস ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে তিনি জিয়া হলে যেতেন। তাই ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি নতুন রূপে ফিরে এলে তা নতুন প্রজন্মের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বিজ্ঞাপন

শেখপাড়া এলাকার বাসিন্দা সাজেদুল হক প্রিন্সের মতে, ভবনটি ভেঙে গেলেও মানুষের স্মৃতি থেকে নামটি মুছে যায়নি। তিনি মনে করেন, একই স্থানে জিয়া হলের পরিচয় বজায় রেখে নতুন কমপ্লেক্স নির্মাণ করা উচিত।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও একই ধরনের মতামত দিয়েছেন। তাদের দাবি, রাজনৈতিক কারণে বারবার নাম পরিবর্তনের পরিবর্তে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক পরিচয় সংরক্ষণ করা প্রয়োজন ছিল। ভবনটি সংরক্ষণ করা গেলে খুলনার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অক্ষুণ্ন থাকত বলেও তারা মনে করেন।

বিজ্ঞাপন

‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ কমিটির খুলনা মহানগর শাখার সভাপতি সাকিব রেজা বলেন, আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি কনভেনশন ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র খুলনায় দীর্ঘদিনের দাবি। জিয়া হল কমপ্লেক্স নির্মিত হলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের অনুষ্ঠান আয়োজনের সুযোগ তৈরি হবে এবং নগরবাসী একটি আধুনিক নাগরিক সুবিধা পাবে।

এ বিষয়ে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা আবির উল জব্বার জানান, প্রকল্পের নামকরণ সংক্রান্ত অনুমোদন পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় চিঠিপত্র পাঠানো হয়েছে। নামকরণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই পরবর্তী প্রশাসনিক ও কারিগরি কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৩০ শতাংশ বহন করবে খুলনা সিটি কর্পোরেশন এবং বাকি অর্থ সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হবে। নাম অনুমোদনের বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

এখন নতুন রূপে ফিরে আসার অপেক্ষায় বহু স্মৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষী ‘জিয়া হল’। তবে সেই পথের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নামকরণ সংক্রান্ত অনুমোদন। বিষয়টির সমাধান হলে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে খুলনাবাসী হয়তো আবারও পাবে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক ও নাগরিক কেন্দ্র।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD