রক্তদানে মানবতার দৃষ্টান্ত হেলাল উদ্দিন, বাঁচিয়েছেন হাজারো প্রাণ

কেউ সমাজসেবা করেন দায়িত্ববোধ থেকে, কেউ করেন মানবিকতার তাগিদে। তবে গাজীপুরের কাপাসিয়ার মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিনের কাছে মানবসেবা যেন জীবনেরই অংশ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে নীরবে-নিভৃতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন এলাকার মানুষের আস্থার নাম।
বিজ্ঞাপন
কাপাসিয়া সদর ইউনিয়নের বাসস্ট্যান্ড এলাকার বাসিন্দা হেলাল উদ্দিন ছাত্রজীবন থেকেই সমাজকল্যাণমূলক কাজে যুক্ত। ২০০৩ সালে দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্থানীয় মুরব্বিদের আস্থায় কাপাসিয়া কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মসজিদের কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। একই সময়ে তিনি দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পাঠদানের উদ্যোগ নেন। শিক্ষার্থীদের খাতা-কলম ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণও নিজের উদ্যোগে সংগ্রহ করে দিতেন।
২০১২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বেচ্ছাসেবী ও অরাজনৈতিক সংগঠন ‘রক্তদান সেবা সংঘ কাপাসিয়া’। তখন এলাকায় রক্তদান সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সচেতনতা ছিল খুবই কম। নানা কুসংস্কার ও ভুল ধারণার কারণে অনেকেই রক্তদানে আগ্রহী ছিলেন না।
বিজ্ঞাপন
হেলাল উদ্দিন বলেন, কাপাসিয়ায় প্রথম আমরাই রক্তদানভিত্তিক সংগঠন গড়ে তুলি। শুরুতে অনেক বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। অনেকে মনে করতেন রক্তদান করলে শরীরের ক্ষতি হয়। কিন্তু মানুষের প্রয়োজনে পাশে থাকার কারণে ধীরে ধীরে সবার ধারণা বদলেছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে সংগঠনটির মাধ্যমে প্রায় ১৫ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, জটিল রোগে আক্রান্ত রোগীসহ অসংখ্য মানুষের জীবন বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এই উদ্যোগ।
ব্যক্তিগতভাবেও হেলাল উদ্দিন ৩৫ বার এ-পজিটিভ (A+) রক্ত দিয়েছেন। তার এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
কাপাসিয়ার ভাকোয়াদি গ্রামের রোকসানা বেগম বলেন, গর্ভাবস্থায় হাসপাতালে গেলে চিকিৎসক দুই ব্যাগ রক্তের প্রয়োজনের কথা জানান। হেলাল ভাইকে ফোন করলে তিনি দ্রুত রক্তের ব্যবস্থা করেন। সময়মতো রক্ত না পেলে বড় বিপদ হতে পারত।
কাপাসিয়া সদর এলাকার আবদুল করিম জানান, তার স্ত্রী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর হেলাল উদ্দিন ও তার সংগঠন চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা করে পাশে দাঁড়ায়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, রাত কিংবা দিন, কারও রক্তের প্রয়োজন হলে হেলাল উদ্দিন ছুটে যান। নিজের কাজের চেয়ে মানুষের প্রয়োজনকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
শুধু রক্তদানেই সীমাবদ্ধ নয় হেলাল উদ্দিনের মানবিক কার্যক্রম। ২০১৭ সালে জামালপুরের ভয়াবহ বন্যায় প্রায় ১১ লাখ টাকার ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ান তিনি ও তার সংগঠনের সদস্যরা। ২০২৪ সালে নোয়াখালীর বন্যাকবলিত এলাকাতেও ত্রাণ ও সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
এছাড়া দুইজন স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও একজন ব্রেইন টিউমার রোগীর চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছে তার সংগঠন। দুইজন এতিম মেয়ের বিয়ের সম্পূর্ণ খরচ বহন করেও মানবিকতার নজির স্থাপন করেছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানেও রক্তদান, চিকিৎসা সহায়তা, দরিদ্র শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা ও বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রয়েছেন হেলাল উদ্দিন।
তিনি বলেন, “আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিন অসহায় মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করব। মানুষের দোয়া ও ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।”
স্থানীয়দের মতে, নিঃস্বার্থ মানবসেবা ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মুহাম্মদ হেলাল উদ্দিন কাপাসিয়ার মানবতার এক উজ্জ্বল প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তার পথচলা নতুন প্রজন্মকে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে উদ্বুদ্ধ করছে।








