Logo

যে গ্রামে যেতে মানুষকে খুলতে হয় পরনের কাপড়

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
লক্ষ্মীপুর
২৭ আগস্ট, ২০২৬, ২০:৩৩
যে গ্রামে যেতে মানুষকে খুলতে হয় পরনের কাপড়
ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের চর ঘাশিয়া গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ যেন কাটছেই না। গ্রামে যাতায়াতের একমাত্র পথের সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে পানিতে ডুবে রয়েছে। একই সঙ্গে এটি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। জোয়ার এলেই সেতুটি পানির নিচে চলে যায়। তখন অনেককে সাঁতরে, আবার কখনো কাপড় খুলে গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে পানি পার হতে হয়। জোয়ারের সময় সেতুর ওপর দিয়ে ছোট নৌকাও চলাচল করে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়রা জানান, প্রায় তিন বছর আগে সরকারি সহায়তা না পেয়ে নিজেদের অর্থে সেখানে একটি ছোট সেতু নির্মাণ করেছিলেন তারা। কিন্তু নির্মাণের এক বছরের মধ্যেই সেতুটির এক পাশ ভেঙে যায়। পরে আবারও চাঁদা তুলে ভাঙা অংশটি মেরামত করেন এলাকাবাসী। কিছুদিন পর সেতুটির অপর পাশও ভেঙে পড়ে। বর্তমানে মাঝের যে অংশটুকু টিকে আছে, সেটিও একদিকে হেলে রয়েছে।

চর ঘাশিয়া গ্রামের বাসিন্দা হেলাল মাঝি বলেন, নিজেদের অর্থে সেতু নির্মাণের পর ভেঙে গেলে সেটিও নিজেদের টাকায় সংস্কার করেছেন তারা। কিন্তু এভাবে আর কতদিন চলবে—এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তার আশঙ্কা, সেতুর অবশিষ্ট অংশও যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।

জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। সেতুর ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে অনেক সময় পুরো অংশ তলিয়ে যায়। তখন মানুষের পাশাপাশি ছোট নৌকাও ওই পথ দিয়ে চলাচল করে। জরুরি প্রয়োজনে কেউ কেউ বাধ্য হয়ে সাঁতরে পার হন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

গ্রামের বাসিন্দা বিলকিস বেগম বলেন, জোয়ারের পানি বাড়লে সন্তানদের নিয়ে বাইরে বের হতে ভয় লাগে। অনেক সময় কাপড় ভিজে যাওয়ায় সঙ্গে গামছা রাখতে হয়। পানি বেশি হলে কাপড় খুলে গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে পার হতে হয়। বিষয়টি তাদের জন্য যেমন কষ্টকর, তেমনি বিব্রতকরও।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গ্রামের অনেকের কাছেই এখন গামছা যেন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস। বাইরে যাওয়ার সময় সঙ্গে গামছা রাখেন তারা। জোয়ারের পানি বেশি হলে কাপড় ভিজে যাওয়ার আশঙ্কায় গামছা দিয়ে শরীর ঢেকে পানি পার হতে হয়।

বিজ্ঞাপন

এই দুর্ভোগ থেকে রেহাই পাচ্ছে না স্কুলগামী শিশুরাও। প্রতিদিন ঝুঁকিপূর্ণ সেতু পার হয়ে তাদের বিদ্যালয়ে যেতে হয়। জোয়ারের সময় পানি বেড়ে গেলে অনেক অভিভাবক সন্তানদের স্কুলে পাঠাতেও ভয় পান। বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের চলাচলও হয়ে পড়ে অত্যন্ত কঠিন।

স্থানীয় বাসিন্দা রাসেল মাঝি বলেন, প্রতিদিন এই সেতু দিয়ে শিশু, নারী ও বয়স্করা যাতায়াত করেন। মাঝের অংশ হেলে থাকায় সামান্য অসতর্কতাতেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই দ্রুত সেখানে একটি নিরাপদ ও টেকসই সেতু নির্মাণের দাবি জানান তিনি।

সেতুর কারণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরাও। মাঠের উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ব্যবহার করতে হয়। এমনকি কোনো রোগীকে জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রেও নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হয়।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় কৃষক বাবুল বেপারী জানান, কৃষিপণ্য নিয়ে সেতু পার হওয়ার সময় ভ্যানসহ পড়ে গিয়ে তার হাতের আঙুল ভেঙে যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানও কেটে গুরুতর আহত হন তিনি। কৃষকদের নিয়মিত এই পথ ব্যবহার করতে হয় বলে দ্রুত নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

গৃহবধূ রাহিমা বলেন, সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, বাজারে যাওয়া কিংবা অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই সেতুটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবসময় ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। সেখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ হলে গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।

এলাকাবাসীর ভাষ্য, নিজেদের উদ্যোগে নির্মিত সেতুটি এখন আর সংস্কার করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত একটি অস্থায়ী পারাপারের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী ও টেকসই সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

কুদ্দুস বেপারী বলেন, আপাতত অস্থায়ীভাবে হলেও নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা প্রয়োজন। তবে তাদের মূল দাবি, দ্রুত সেখানে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণ করা। এতে দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবেন চর ঘাশিয়া গ্রামের মানুষ।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে। জোয়ারের পানিতে সাঁতরে কিংবা কাপড় খুলে গামছা হাতে পারাপার নয়—একটি নিরাপদ ও স্থায়ী সেতু দিয়ে স্বাভাবিকভাবে চলাচলের সুযোগ চান তারা।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD