ঘরে বসে গহনা তৈরি, মহেশপুরে বদলেছে ৮ হাজার মানুষের জীবন

সংসারের ব্যস্ততার মধ্যেই ঘরে বসে ইমিটেশনের গহনা তৈরি করে আয় করছেন ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার হাজারো নারী। তাদের হাতে তৈরি হচ্ছে কানের দুল, আংটি, চিক, সীতাহার, রুলি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আধুনিক নকশার গহনা।
বিজ্ঞাপন
শুধু নারীরাই নন, উৎপাদন, নকশা, রং করা ও বাজারজাতকরণসহ নানা কাজে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় পুরুষরাও। দীর্ঘদিনের চর্চায় সীমান্তবর্তী এ উপজেলায় গড়ে উঠেছে ইমিটেশনের গহনা তৈরির একটি সম্ভাবনাময় শিল্প।
স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে মহেশপুরের কয়েকটি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার নারী-পুরুষ প্রত্যক্ষভাবে এ শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বাড়িতে বসে কাজের সুযোগ থাকায় বিশেষ করে গ্রামীণ নারীদের জন্য এটি বাড়তি আয়ের বড় একটি উৎস হয়ে উঠেছে।
সংসারের দায়িত্ব সামলে নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করে আয় করছেন তারা। এতে অনেক নারী যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, তেমনি স্থানীয় পর্যায়ে তৈরি হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ।
বিজ্ঞাপন
মহেশপুরের যেসব গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে ইমিটেশনের গহনা তৈরি হচ্ছে, সেসব এলাকা স্থানীয়ভাবে এখন ‘ইমিটেশনের গহনার গ্রাম’ হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছে।
এখানকার তৈরি গহনার মান ও নকশা ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকাররা এসে গহনা সংগ্রহ করেন। স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব গহনা যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজারে।
মহেশপুর পৌরসভার নৌদা গ্রামের গৃহবধূ সোনিয়া খাতুন প্রায় ১৪ থেকে ১৫ বছর ধরে গহনা তৈরির কাজ করছেন। তিনি বলেন, সংসারের কাজ শেষ করে অবসর সময়ে গহনা তৈরি করেন।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন এ কাজ থেকে প্রায় ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়। বিয়ের পর এই গ্রামে এসে তিনি গহনা তৈরির কাজ শেখেন। শুরুতে কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও দীর্ঘদিনের চর্চায় এখন প্রায় সব ধরনের গহনা তৈরি করতে পারেন তিনি।
সোনিয়া খাতুনের মতো একই গ্রামের আরও অনেক নারী দীর্ঘদিন ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকেই বাড়ির কাজের পাশাপাশি গহনা তৈরি করে পরিবারের আয়-রোজগারে ভূমিকা রাখছেন।
একই গ্রামের গৃহবধূ রহিমা জানান, তাদের এলাকায় প্রায় দুই দশক আগে ইমিটেশনের গহনা তৈরির কাজ শুরু হয়। তখন থেকেই তিনি এ কাজের সঙ্গে যুক্ত। প্রতিদিন সংসারের কাজ শেষ করে প্রায় সাত থেকে আট ঘণ্টা গহনা তৈরির কাজ করেন। এ থেকে দৈনিক প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় হয়।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়রা জানান, প্রথমদিকে মহেশপুরে ইমিটেশনের গহনা তৈরির কাজ ছিল খুবই সীমিত। অল্প কয়েকজন কারিগর ছোট পরিসরে কানের দুল ও আংটির মতো গহনা তৈরি করতেন। সময়ের সঙ্গে কাজের পরিধি ও বাজার বাড়তে থাকে। বর্তমানে স্থানীয় কারিগররা বিভিন্ন ধরনের আধুনিক নকশার গহনা তৈরিতে দক্ষ হয়ে উঠেছেন।
গহনা তৈরির পাশাপাশি এ শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ছোট-বড় বেশ কিছু কারখানা। এসব কারখানায় স্থানীয় নারী-পুরুষ কাজ করছেন। কেউ গহনার বিভিন্ন অংশ তৈরি করছেন, কেউ নকশা করছেন, আবার কেউ পণ্য প্রস্তুত ও বাজারজাতকরণের কাজে যুক্ত রয়েছেন। ফলে একটি গহনা তৈরির সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় কারখানা মালিক শান্ত জানান, তার কারখানায় বর্তমানে পাঁচ থেকে ছয়জন কর্মচারী কাজ করেন। প্রায় সাত থেকে আট বছর ধরে তিনি এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। প্রতি মাসে তার কারখানা থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকার গহনা বিক্রি হয়। রং করার কাজ ছাড়া গহনা তৈরির প্রায় সব ধরনের কাজই তার কারখানায় সম্পন্ন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
আরেক কারখানা মালিক ইমরান হোসেন বলেন, সিটি গোল্ডের গহনা তৈরির কারণে এলাকার বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই ব্যবসাকে আরও বড় করতে সহজ শর্তে এবং স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা পাওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি আরও মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
কাঁচামালের সংকটের কথাও জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ইমরান হোসেন বলেন, ইমিটেশনের গহনা তৈরির অধিকাংশ কাঁচামাল ভারত থেকে আমদানি করতে হয়। অনেক সময় প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো পাওয়া যায় না। দেশে এসব কাঁচামাল উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে ব্যবসায়ীদের জন্য যেমন সুবিধা হবে, তেমনি উৎপাদন খরচও কমানো সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় ব্যবসায়ী রিপনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০০৪ সালের দিকে মহেশপুর উপজেলায় ‘সিটি গোল্ড’ নামে ইমিটেশনের গহনা তৈরির কারখানা গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ধীরে ধীরে এ ব্যবসা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে অর্ধশতাধিক কারখানায় বিভিন্ন ধরনের ইমিটেশনের গহনা তৈরি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, একসময় এখানে প্রধানত কানের দুল ও আংটির মতো ছোট আকারের গহনা তৈরি হতো। বর্তমানে কারিগরদের দক্ষতা বাড়ায় আধুনিক নকশার নানা ধরনের গহনা তৈরি করা হচ্ছে। বাজারের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নতুন নতুন ডিজাইনও যুক্ত হচ্ছে উৎপাদনে।
মহেশপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজ্জাদ হোসেন বলেন, উপজেলার চারটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার নারী ও পুরুষ সিটি গোল্ডের গহনা তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ শিল্পকে আরও সম্প্রসারণ এবং এর সঙ্গে যুক্ত মানুষের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টদের মতে, মহেশপুরের ইমিটেশনের গহনা শিল্প এখন শুধু স্থানীয় পর্যায়ের একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি বড় কর্মসংস্থানভিত্তিক শিল্পে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ থাকায় গ্রামীণ নারীদের জন্য এ শিল্পের গুরুত্ব অনেক বেশি। এতে নারীদের হাতে নিজস্ব আয় আসছে এবং পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতিতেও তারা ভূমিকা রাখছেন।
তবে শিল্পটির আরও বিকাশের পথে রয়েছে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের অনিয়মিত সরবরাহ, মূলধনের সংকট এবং আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণের অভাব শিল্পটির সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়া গেলে এসব সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলেন, সহজ শর্তে ঋণ, নিয়মিত কাঁচামাল সরবরাহ, কারিগরদের আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া গেলে মহেশপুরের এই শিল্প আরও বড় পরিসরে বিকশিত হতে পারে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি মানসম্মত পণ্য তৈরি করা সম্ভব হলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক বাজারেও এসব গহনা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিল্পের সফলতা শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; এর সঙ্গে কত মানুষের জীবিকা যুক্ত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সেই দিক থেকে মহেশপুরের ইমিটেশনের গহনা শিল্প স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতোমধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ঘরে বসে নারীদের আয়, কারখানায় পুরুষ-নারীর কর্মসংস্থান এবং পাইকারি বাজারে পণ্য সরবরাহ—সব মিলিয়ে এ শিল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
সীমান্তবর্তী মহেশপুরের গ্রামগুলোতে তৈরি হওয়া এসব ইমিটেশনের গহনা এখন শুধু নারীর সাজসজ্জার সামগ্রী নয়। হাজারো মানুষের জীবিকার অবলম্বন, গ্রামীণ নারীর স্বাবলম্বিতা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশে এটি হয়ে উঠেছে সম্ভাবনাময় একটি খাত। প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে মহেশপুরের এই শিল্প ভবিষ্যতে আরও বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।








