Logo

ক্লাস শেষে ড্রাগন বাগানে ছুটে যান শিক্ষক, আয় ১৪ লাখ

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
শ্রীপুর, গাজীপুর
৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৫:৩৬
ক্লাস শেষে ড্রাগন বাগানে ছুটে যান শিক্ষক, আয় ১৪ লাখ
ছবি: প্রতিনিধি

শিক্ষকতা পেশা হলেও কৃষির প্রতি রয়েছে তার গভীর ভালোবাসা। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের পর অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে চার বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন ড্রাগন ফলের বাগান। পরিশ্রম, ধৈর্য ও পরিকল্পিত পরিচর্যায় সেই বাগান থেকেই এখন বছরে প্রায় ২০ লাখ টাকার ফল বিক্রি করছেন গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার দক্ষিণপাড়ার শিক্ষক ফারুক আহমেদ। সব খরচ বাদ দিয়ে তার নিট আয় প্রায় ১৪ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

ফারুক আহমেদ তেলিহাটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তিনি ফরিদপুর গ্রামের ওয়াজ উদ্দিনের ছেলে। শিক্ষকতার পাশাপাশি বাড়তি কিছু করার চিন্তা থেকেই কয়েক বছর আগে ড্রাগন চাষে আগ্রহী হন তিনি। সেই আগ্রহ থেকেই ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে আবদার গ্রামের শাহিদ মেম্বারের কাছ থেকে চার বিঘা জমি ১০ বছরের জন্য সাড়ে তিন লাখ টাকায় লিজ নেন।

জমি নেওয়ার পর শুরু হয় বাগান তৈরির কাজ। ড্রাগন চাষের উপযোগী করতে জমিতে সারিবদ্ধভাবে পিলার নির্মাণ করা হয়। বাগানের প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরিতেই তার প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। তৈরি করা হয় সাড়ে ৭৫০টির মতো পিলার। প্রতিটি পিলারে চার থেকে পাঁচটি করে চারা রোপণ করা হয়। শুরুতে প্রায় চার হাজার চারা দিয়ে বাগান শুরু করলেও পরে গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে বাগানে বিপুলসংখ্যক ড্রাগন চারা রয়েছে বলে জানান ফারুক আহমেদ।

তবে শুরুর পথটা সহজ ছিল না। প্রথম বছর বাগান তৈরিতে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও কোনো ফলন পাননি তিনি। এতে হতাশ না হয়ে নিয়মিত পরিচর্যা অব্যাহত রাখেন। গাছের বৃদ্ধি, সার প্রয়োগ, সেচ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে দেন বিশেষ গুরুত্ব।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় বছর থেকে গাছে ফল আসতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে উৎপাদন। বর্তমানে বাগান থেকে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ কেজি ড্রাগন ফল সংগ্রহ করা হয়। প্রতি কেজি গড়ে ১৫০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি হওয়ায় বছরে প্রায় ১৫ থেকে ১৮ টন ফল উৎপাদন হচ্ছে। এতে বার্ষিক বিক্রি প্রায় ২০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।

ফারুকের হিসাবে, সার, শ্রমিকের মজুরি, সেচ, গাছের পরিচর্যা ও অন্যান্য খাতে বছরে প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ হয়। সব ব্যয় বাদ দিয়ে তার নিট আয় থাকে আনুমানিক ১৪ লাখ টাকা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ফারুক আহমেদ বলেন, ড্রাগন চাষে প্রাথমিক বিনিয়োগ তুলনামূলক বেশি হলেও বাগান একবার ভালোভাবে দাঁড়িয়ে গেলে নিয়মিত পরিচর্যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায়। প্রথম দিকে ফলন না পাওয়ায় অনেকে তাকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু তিনি ধৈর্য হারাননি। নিয়মিত পরিচর্যার ফল হিসেবে এখন বাগান থেকে ভালো ফলন ও আয় হচ্ছে।

তিনি বলেন, শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিকে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল অবসর সময়কে কাজে লাগানো এবং কৃষিতে নতুন কিছু করার চেষ্টা। ড্রাগন চাষে সফলতার পর তার বিশ্বাস, পরিকল্পিতভাবে উচ্চমূল্যের ফল চাষ করা গেলে কৃষি শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, লাভজনক ব্যবসারও সুযোগ তৈরি করতে পারে।

বাগানের ড্রাগন ফল আকার, স্বাদ ও মিষ্টতার দিক থেকে ভালো হওয়ায় স্থানীয় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। ফল পাকার মৌসুমে বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি বাগানে এসে ফল কিনে নিয়ে যান। অনেক সময় বাজারে পাঠানোর আগেই বাগানের ফল বিক্রি হয়ে যায়। ফলে আলাদাভাবে বাজারজাতকরণের ঝামেলাও তুলনামূলক কম।

বিজ্ঞাপন

সরেজমিনে দেখা যায়, চার বিঘা জমিজুড়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পিলার। প্রতিটি পিলার ঘিরে বেড়ে উঠেছে ড্রাগন গাছ। কোথাও সবুজ ডালপালা, আবার কোথাও ঝুলছে পাকা ফল। পুরো বাগানজুড়ে তৈরি হয়েছে মনোরম কৃষি পরিবেশ। বাগানের দৃশ্য দেখতে স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও এ জমিতে প্রচলিত কৃষিকাজ করা হতো। এখন সেখানে আধুনিক পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষ হচ্ছে। ফারুক আহমেদের উদ্যোগ দেখে এলাকার অনেকেই উচ্চমূল্যের ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

বাগান সংশ্লিষ্টরা জানান, ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে নিরাপদ পদ্ধতিতে ফল উৎপাদনের চেষ্টা করা হচ্ছে। গাছের পরিচর্যা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ ও অন্যান্য কার্যক্রমে নিয়ম মেনে কাজ করা হয়। এতে ফলের মান ভালো থাকছে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

শ্রীপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সুমাইয়া সুলতানা বন্যা বলেন, শ্রীপুর উপজেলায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ হেক্টর জমিতে ড্রাগন ফলের বাগান রয়েছে। ড্রাগন ফলের চাহিদা রয়েছে এবং এটি দিয়ে জেলি, শরবতসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যও তৈরি করা যায়।

তিনি বলেন, তেলিহাটি ইউনিয়নের আবদার গ্রামের ফারুক আহমেদের ড্রাগন বাগানটি কৃষি অফিসের নজরদারিতে রয়েছে। নিরাপদ পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, বাগানের পরিচর্যা ও উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়েও কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে ড্রাগন ফলের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। সঠিক জাত নির্বাচন, আধুনিক চাষপদ্ধতি, যথাযথ পরিচর্যা ও কার্যকর বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে ড্রাগন ফলের বাণিজ্যিক চাষ কৃষকদের জন্য ভালো আয়ের উৎস হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষকতার পাশাপাশি ফারুক আহমেদের এই উদ্যোগ সেই সম্ভাবনারই একটি উদাহরণ। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকতা আর কর্মঘণ্টার বাইরে বাগানে শ্রম—দুইয়ের সমন্বয়ে তিনি এখন স্থানীয়ভাবে একজন শিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছেন।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD