Logo

দুর্গাপূজার মৌসুমেও মন্দা জামনগরের ঐতিহ্যবাহী শাঁখার ব্যবসায়

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
বাগাতিপাড়া, নাটোর
৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৫:০১
দুর্গাপূজার মৌসুমেও মন্দা জামনগরের ঐতিহ্যবাহী শাঁখার ব্যবসায়
ছবি: সংগৃহীত

শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। সামনে শারদীয় দুর্গাপূজা। এ সময়টায় সাধারণত ব্যস্ত হয়ে ওঠে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শাঁখারী পল্লী। কিন্তু এবার সেই চেনা ব্যস্ততা নেই। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কারিগরেরা শাঁখা তৈরিতে ব্যস্ত থাকলেও কমেছে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা ও অর্ডার। ফলে বছরের সবচেয়ে বড় বিক্রির মৌসুমেও মন্দার মুখে পড়েছেন কারিগর ও ব্যবসায়ীরা।

বিজ্ঞাপন

জামনগর গ্রামের প্রায় শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে শাঁখা তৈরির সঙ্গে জড়িত। বংশপরম্পরায় চলে আসা এ পেশা তাঁদের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। সারা বছর শাঁখার বেচাকেনা থাকলেও দুর্গাপূজাকে ঘিরে কয়েক মাস আগে থেকেই বাড়ে উৎপাদন। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা জামনগরে এসে বড় পরিমাণে শাঁখা সংগ্রহ করেন। তবে এবার ব্যবসার সেই চিত্র বদলে গেছে।

কারিগরদের ভাষ্য, অন্যান্য বছর পূজার কয়েক মাস আগে থেকেই বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যাপারীরা জামনগরে আসতে শুরু করেন। একসঙ্গে বড় অর্ডার পাওয়ায় তখন উৎপাদনও বেড়ে যায়। এবার ব্যাপারীর সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি কমেছে অর্ডারও। ফলে শাঁখা তৈরি চললেও প্রস্তুত পণ্য আগের মতো বিক্রি হচ্ছে না।

জামনগরের শাঁখারী কারিগর তুলসি সেন বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি শাঁখা তৈরির কাজ করছেন। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতেও টানা ৩৮ বছর ধরে একই পেশায় রয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, আগে পূজার আগে ব্যবসায়ীদের ভিড় বেড়ে যেত, সেই সঙ্গে বাড়ত কাজের চাপও। সারা বছর যেখানে মাসে গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার ব্যবসা হতো, পূজার এক-দুই মাস আগে তা বেড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত উঠত। কিন্তু এবার পূজার মৌসুমেও ব্যবসা সারা বছরের মতোই চলছে।

বিজ্ঞাপন

তুলসি সেন বলেন, পূজা এখনো কয়েক দিন দূরে। শেষ সময়ে বিক্রি বাড়বে—এমন আশায় রয়েছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আরেক কারিগর জগন্নাথ পাল জগা জানান, তাঁদের পরিবার বাপ-দাদার সময় থেকেই শাঁখা তৈরির সঙ্গে যুক্ত। একটি শাঁখা প্রস্তুত করতে কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে গোটা শঙ্খ আসে। এরপর সেটি ভাঙা, কাটা, পিস করা, ঘষামাজা ও নকশা করার কাজ হয়। সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচটি ধাপের পর একটি শাঁখা প্রস্তুত হয়।

বিজ্ঞাপন

জগন্নাথ পাল বলেন, পূজার সময়ই তাঁদের বছরের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত সেই চাহিদা দেখা যায়নি। কাঁচামালের দাম খুব বেশি না বাড়লেও শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। আগে ৪০০ টাকায় যে শ্রমিক পাওয়া যেত, এখন ৮০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া কঠিন। দেশের বাইরে থেকে আসা ব্যবসায়ীদের চাহিদাও কমেছে। সব মিলিয়ে এবারের ব্যবসা সন্তোষজনক নয়।

কারিগররা জানান, শাঁখার প্রধান কাঁচামাল শঙ্খ ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা হয়। পুরুষ কারিগরেরা শঙ্খ কেটে শাঁখা, বালা ও আংটির আকৃতি দেন। এরপর নারীরা সেগুলোতে নকশা ও কারুকাজ করেন। আকার, নকশা ও উপকরণভেদে এক জোড়া শাঁখা তৈরিতে প্রায় ২০০ থেকে ১ হাজার টাকা খরচ হয়। স্বর্ণের কাজ করা শাঁখার ক্ষেত্রে খরচ দাঁড়ায় ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।

জামনগরের কারিগরেরা পাথর শাঁখা, সোনা শাঁখা, সাদা শাঁখা, কড়ি শাঁখা, মোটা ও চিকন শাঁখা, চূড়া, ব্রেসলেট ও মান্তরাসহ বিভিন্ন ধরনের শাঁখা তৈরি করেন। এসব পণ্য দেশের বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, বরিশাল, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে বিক্রি হয়। ঢাকাসহ অন্যান্য জেলার ব্যবসায়ীরাও সরাসরি জামনগরে এসে পণ্য সংগ্রহ করেন। আবার অনেকে মুঠোফোনে অর্ডার দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে শাঁখা নিয়ে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, জামনগরের শাঁখারী পল্লীর ইতিহাস কয়েক শত বছরের পুরোনো। ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে শঙ্খশিল্পীরা দেশের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েন। তাঁদের একটি বড় অংশ নাটোরের বাগাতিপাড়ার জামনগরে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। এরপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এখানকার পরিবারগুলো শাঁখা ও শঙ্খের অলংকার তৈরির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।

তবে ব্যবসায় মন্দা দেখা দেওয়ায় কেউ কেউ এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। শাঁখারী ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, কয়েক মাস আগে তিনি ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছেন। আগের মতো ব্যবসা না থাকায় এ পেশা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ী মিন্টু কুমার সেন বলেন, জামনগর এলাকায় প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী শাঁখা শিল্পের সঙ্গে জড়িত। তবে আগের তুলনায় ব্যবসা অনেকটাই কমে গেছে। পূজার মৌসুমে সাধারণত বিক্রি বাড়লেও এবার বাইরের ব্যাপারীদের উপস্থিতিও কম।

বিজ্ঞাপন

শাঁখারী পল্লীর কারিগরেরা জানান, শ্রমিকের মজুরি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় শাঁখা তৈরির খরচ বেড়েছে। অন্যদিকে বাজারে চাহিদা কম থাকায় আগের মতো লাভ হচ্ছে না। তারপরও বংশপরম্পরায় পাওয়া এ পেশা টিকিয়ে রাখতে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন।

জামনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী বলেন, শাঁখারী পল্লীর কারিগরেরা যুগ যুগ ধরে এ ঐতিহ্যবাহী পেশার সঙ্গে যুক্ত। প্রায় শতাধিক পরিবার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এটি জামনগর ইউনিয়নের গর্ব। তাঁদের বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।

বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শামসুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি শাঁখারী পল্লী পরিদর্শন করেছেন। শাঁখা শিল্প এ অঞ্চলের গৌরব ও ঐতিহ্যের অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে শাঁখা কিনতে আসেন। এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের উন্নয়ন এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD