লাঠিতে ভর দিয়ে ভ্যানের প্যাডেলে জীবন চলছে ৭০ বছরের বৃদ্ধের

ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় বয়সের ভার আর শারীরিক অক্ষমতা কোনো কিছুই থামাতে পারেনি ৭০ বছরের হযরত আলীকে। এক পা পুরোপুরি অচল হওয়ায় হাঁটতে গেলে লাঠি কিংবা টেচারের সাহায্য নিতে হয় তাকে। শরীরও নুয়ে পড়েছে বয়সের ভারে। তবুও প্রতিদিন সকালে ঘর থেকে বের হন তিনি। জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে সঙ্গে নেন পুরোনো একটি ভ্যান।
বিজ্ঞাপন
মুক্তাগাছা উপজেলার রামচন্দ্রপুর দিঘীর পাড়ে ছোট্ট একটি ঘরে বসবাস করেন হযরত আলী। তার বর্তমান সংসারে রয়েছে সাত বছরের দুই সন্তান। তাদের খাবার, পোশাকসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালানোর দায়িত্ব তার কাঁধেই। ফলে বয়স কিংবা শারীরিক অক্ষমতা—কোনোটিই তাকে ঘরে বসে থাকার সুযোগ দেয় না।
প্রতিদিন সকালে ভ্যান নিয়ে বের হওয়ার আগে হাঁটার লাঠিটি ভ্যানের সঙ্গে বেঁধে রাখেন হযরত আলী। সারাদিন কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে ভ্যান থেকে নামার সময় আবার সেই লাঠিই তার ভরসা হয়ে ওঠে। অনেক সময় স্ত্রীকে টেচার এগিয়ে দিতে হয়। সেটিতে ভর করে ধীরে ধীরে ঘরের ভেতরে প্রবেশ করেন তিনি।
দূর থেকে দেখলে মনে হতে পারে, বৃদ্ধ একজন মানুষ হয়তো নিজের প্রয়োজনে কোথাও যাচ্ছেন। কিন্তু কাছে গেলে বোঝা যায়, তার প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই। বয়সে নুয়ে পড়া এই মানুষটি প্রতিদিন নিজের শরীরের সীমাবদ্ধতাকে পেছনে ফেলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
হযরত আলীর এই কষ্টের জীবন অবশ্য নতুন নয়। কয়েক বছর আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান তার প্রথম স্ত্রী। এরপর ক্যানসারে আক্রান্ত মেয়ের চিকিৎসার পেছনে নিজের সঞ্চয় এবং শেষ সম্বলটুকুও খরচ করেন তিনি। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে শেষ পর্যন্ত মেয়েকেও হারাতে হয় তাকে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এরপর দ্বিতীয় সংসারে নতুন করে ঘর বাঁধেন হযরত আলী। এই সংসারে সাত বছরের দুই সন্তান রয়েছে। আগের সংসারে থাকা তার এক ছেলেও শারীরিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক নন। ফলে পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হিসেবে হযরত আলীর ওপরই রয়েছে বড় দায়িত্ব।
বিজ্ঞাপন
শারীরিকভাবে অক্ষম হলেও অন্যের কাছে হাত পাততে চান না তিনি। নিজের শ্রমে যতটুকু সম্ভব আয় করেই সংসার চালাতে চান। কিন্তু সেই আত্মসম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার পথও তার জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রায় দুই মাস আগে তার জীবিকার প্রধান অবলম্বন ছিল একটি মিশুক। প্রতিদিনের মতো সেটি নিয়ে সেদিনও বের হয়েছিলেন হযরত আলী। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা থেকে দুই ব্যক্তি মিশুকটি ভাড়া করে তাকে মধুপুর পৌর শহরের দিকে নিয়ে যান।
পথে মিশুকে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে যন্ত্রাংশ কেনার জন্য যান হযরত আলী। এ সময় দুই যাত্রীর একজন অসহায় বৃদ্ধের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে তার হাত ধরে রাস্তা পার করে দেন। কিন্তু সেই সহানুভূতির আড়ালেই যে প্রতারণার পরিকল্পনা ছিল, তা বুঝতে পারেননি তিনি।
বিজ্ঞাপন
যন্ত্রাংশ কিনে ফিরে এসে হযরত আলী দেখেন, সেখানে তার মিশুক নেই। নেই সেই দুই যাত্রীও। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে হারিয়ে যায় তার পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস।
মিশুক হারিয়ে বোয়ালী সেতুর পাশে লাঠি হাতে বসে দীর্ঘ সময় কেঁদেছিলেন হযরত আলী। সেই কান্না শুধু একটি যান হারানোর কষ্ট ছিল না; এর সঙ্গে যেন হারিয়ে গিয়েছিল তার পরিবারের প্রতিদিনের খাবারের নিশ্চয়তাও।
পরে স্থানীয়রা এগিয়ে এসে তাকে বাড়ি ফেরার ভাড়া দেন। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ দেখে মিশুক উদ্ধারের চেষ্টা করার কথাও জানান তারা। তবে শেষ পর্যন্ত মিশুকটি আর উদ্ধার হয়নি। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন হযরত আলী। কিন্তু তাতেও কোনো প্রতিকার পাননি তিনি।
বিজ্ঞাপন
এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই মাস। এই সময়ে তার সংসারের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। মিশুক হারানোর পর আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অভাব নেমে আসে পরিবারে। শেষ পর্যন্ত সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে কিছুদিন আগে একটি পুরোনো ভ্যান কেনেন তিনি। সেই ভ্যান নিয়েই আবার নতুন করে জীবিকার লড়াই শুরু করেছেন।
তবে ভ্যান কেনার ঋণের কিস্তির সঙ্গে সংসারের দৈনন্দিন খরচ মেলাতে পারছেন না হযরত আলী। সারাদিন পরিশ্রমের পর যে আয় হয়, তা দিয়ে সমিতির কিস্তি পরিশোধ করাই কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে রয়েছে দুই শিশুর খাবার, পোশাক, চিকিৎসা এবং ঘরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ। ফলে খেয়ে না খেয়েই দিন কাটছে পরিবারটির।
হযরত আলীর সবচেয়ে বড় বাধা তার নিজের শরীর। হাঁটার সময় তাকে একটি পা টেনে নিতে হয়। লাঠিতে ভর না দিলে কয়েক কদম এগোনোও কঠিন। অথচ সেই শরীর নিয়েই তাকে ভ্যান চালাতে হচ্ছে। কারণ তিনি ঘরে বসে থাকলে পরিবারের চুলায় আগুন জ্বলবে না।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দা রহমত মিয়া বলেন, হযরত আলীর জীবনসংগ্রাম তারা প্রতিদিন চোখের সামনে দেখছেন। বয়স ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সক্ষমতা তার নেই। তারপরও সন্তানদের কথা ভেবে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
মুদি দোকানি জামাল মিয়া বলেন, হযরত আলীর মতো অসহায় একজন বৃদ্ধের পাশে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে তার একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডও নেই। ফলে বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধার বাইরে রয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দের মতে, হযরত আলীর পরিবারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি একটি স্থায়ী ও নিরাপদ আয়ের ব্যবস্থা। একই সঙ্গে প্রয়োজন তার চিকিৎসা এবং দুই শিশুর জন্য সহায়তা। জীবিকার একটি নিরাপদ ব্যবস্থা করা গেলে হয়তো জীবনের শেষ সময়ে এসে প্রতিদিন তাকে ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতে হবে না।
বিজ্ঞাপন
প্রতিদিন সকালে লাঠিটি ভ্যানের সঙ্গে বেঁধে ঘর থেকে বের হন হযরত আলী। সারাদিন ভ্যান চালানোর পর সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরেন। ভ্যান থেকে নামার সময় আবার হাতে তুলে নেন সেই লাঠি। এরপর স্ত্রীর সহায়তায় টেচারে ভর করে ধীরে ধীরে প্রবেশ করেন ছোট্ট ঘরে।
দুই সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই হয়তো প্রতিদিন সকালে নতুন করে শক্তি খুঁজে পান হযরত আলী। শরীর তাকে থামিয়ে দিতে চায়, বয়স তাকে বিশ্রামের কথা বলে, আর দারিদ্র্য প্রতিনিয়ত তাকে হার মানানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি এখনো রাস্তায় নামেন।
লাঠিতে ভর দিয়ে ভ্যানের প্যাডেলে পা রাখেন ৭০ বছরের এই বৃদ্ধ। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও থামেনি তার সংগ্রাম। নিজের অসহায়ত্বকে সঙ্গী করেই দুই সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে প্রতিদিন বেঁচে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন হযরত আলী।








