জুড়ীতে শীতের আগমনী বার্তা, হারিয়ে যাচ্ছে ঘরে ঘরে পিঠা তৈরির ঐতিহ্য

প্রকৃতিতে ধীরে ধীরে জানান দিচ্ছে শীতের আগমনী বার্তা। মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা, সাগরনাল, গোয়ালবাড়ী, পূর্ব জুড়ী, পশ্চিম জুড়ী ও জায়ফরনগর ইউনিয়নসহ হাকালুকি হাওরাঞ্চলে ভোরের দিকে দেখা মিলছে কুয়াশার আভাস। ঋতু পরিবর্তনের এই সময়ে শীতকে ঘিরে মানুষের মধ্যে তৈরি হচ্ছে নানা প্রত্যাশা।
বিজ্ঞাপন
খেজুরের রস, বাহারি পিঠা-পুলি, শীতকালীন সবজি আর খেলাধুলার আয়োজন—সব মিলিয়ে গ্রামীণ জনপদে বইতে শুরু করেছে শীতের আবহ। তবে সময়ের পরিবর্তনে বাড়িতে বাড়িতে পিঠা তৈরির পুরোনো আয়োজন কমে আসছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে কবি ও সাংবাদিক এম এ রাজু বলেন, শীত প্রকৃতিকে ভিন্ন রূপে সাজিয়ে তোলে। কুয়াশায় ঢাকা সকাল, শিশিরভেজা ঘাস আর প্রকৃতির স্নিগ্ধতা মানুষের মনে অন্য রকম অনুভূতি জাগায়। গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতির সঙ্গে শীতের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে।
জুড়ী উপজেলা ফুটবল খেলোয়াড় কল্যাণ সমিতির সভাপতি কামরুল হাসান বলেন, শীতকাল খেলাধুলার জন্য বেশ উপযোগী সময়। এ সময়ে ফুটবল, ক্রিকেট ও ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলাধুলায় তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ে। শীতের মনোরম আবহাওয়া খেলোয়াড়দের মাঠমুখী হতে উৎসাহিত করে। খেলাধুলার মধ্য দিয়ে তরুণদের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিও গড়ে ওঠে।
বিজ্ঞাপন
জুড়ী উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, শীত মানেই খেজুরের রস, ভাপা পিঠা, চিতই পিঠা ও নকশি পিঠার ঘ্রাণ। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর পাশাপাশি এ সময়ে কৃষকের মাঠে দেখা যায় শীতকালীন নানা সবজির সমারোহ। প্রকৃতিতে আসে নতুন প্রাণের স্পন্দন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে শীত সবার জীবনে সমান আনন্দ নিয়ে আসে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, অসহায়, দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের জন্য শীত অনেক সময় দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং তাঁদের হাতে শীতবস্ত্র তুলে দেওয়া প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
জুড়ী মডেল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খলিলুর রহমান মাস্টার বলেন, আগে শীত এলেই গ্রামাঞ্চলের বাড়িতে বাড়িতে নানা ধরনের পিঠা তৈরির ধুম পড়ে যেত। কেউ ঢেঁকিতে চালের গুঁড়া তৈরি করতেন, আবার কেউ প্রচলিত পদ্ধতিতে পিঠা তৈরির উপকরণ প্রস্তুত করতেন। পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের নিয়ে পিঠা তৈরির সেই আয়োজন ছিল গ্রামীণ জীবনের অন্যতম আনন্দ।
তিনি বলেন, সময়ের পরিবর্তনে এসব ঐতিহ্যবাহী রীতি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে নতুন প্রজন্মকে পিঠা-পুলির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন।
এদিকে শীতের আগমনী আবহে জুড়ীর নাইট চৌমুহনী এলাকায় বিভিন্ন ধরনের নকশি পিঠা তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন শাহ আলম। ঐতিহ্যবাহী এসব পিঠা দেখতে যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি স্বাদেও সুস্বাদু। শীতকে কেন্দ্র করে পিঠার চাহিদা বাড়বে বলে প্রত্যাশা তাঁর।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয়দের ভাষ্য, শীত কেবল ঋতু পরিবর্তনের নাম নয়; এটি গ্রামীণ ঐতিহ্য, পারিবারিক বন্ধন ও আনন্দ-উৎসবের এক অনন্য অনুষঙ্গ। শীতের রাতে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমানো কিংবা পাঁচ-ছয়জন মিলে খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহানোর দৃশ্য গ্রামীণ জীবনের চিরচেনা ছবি। আগুনের উষ্ণতায় গল্প-আড্ডা আর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একান্ত সময় কাটানোর মধ্য দিয়ে শীতের আনন্দ হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত।
গ্রামবাংলার এই চিরচেনা আবহ ধরে রাখতে ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পুলি তৈরির সংস্কৃতি নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন স্থানীয়রা।








