Logo

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন : স্ত্রী-দুই মেয়ের পাশে চিরনিদ্রায় নাহিদুর

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
যশোর
২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৯:৫৩
টুপটুপ রিসোর্টে আগুন : স্ত্রী-দুই মেয়ের পাশে চিরনিদ্রায় নাহিদুর
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত যশোরের মণিরামপুরের নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা খাতুন ও দুই মেয়ে ইনায়া-ইহানার দাফন সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (২৭ অক্টোবর) বিকেলে গ্রামের বাড়ির পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি কবরে তাঁদের সমাহিত করা হয়। একই পরিবারের চার সদস্যকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ স্বজন ও এলাকাবাসী।

বিজ্ঞাপন

দুর্ঘটনার ১১ দিন পর বুধবার তাঁদের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয়।

ছুটিতে কক্সবাজার গিয়ে আর ফেরা হলো না

পরিবারের সদস্যরা জানান, পূজার ছুটি কাটাতে গত ১৫ অক্টোবর ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা খাতুন ও দুই মেয়ে ইনায়া এবং ইহানা। পরদিন ১৬ অক্টোবর তাঁরা ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে ওঠেন। ১৮ অক্টোবর দুপুরে তাঁদের চেকআউট করার কথা ছিল।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কিন্তু তার আগেই ১৭ অক্টোবর ভোরে রিসোর্টটিতে ভয়াবহ আগুন লাগে। এ ঘটনায় নাহিদুর, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও ডিএনএ পরীক্ষার কারণে মরদেহ শনাক্ত করতে সময় লাগে। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে ডিএনএ পরীক্ষার প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনি আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে কক্সবাজার পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বুধবার ভোরে চারজনের মরদেহ মণিরামপুরে পৌঁছায়।

শেষ কথাগুলোই এখন স্মৃতি

বিজ্ঞাপন

নাহিদুরের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, তাঁরা দুই ভাই। চাকরির কারণে দুই ভাই-ই গ্রামের বাইরে থাকতেন। মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ায় ‘ফারজানা ম্যানশন’ নামের দোতলা বাড়িতে নাহিদুরের বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমান একাই থাকেন।

বুধবার তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজন ও এলাকাবাসীর ভিড়। বাড়ির বারান্দায় একটি চেয়ারে বসে আছেন মতিয়ার রহমান। তাঁকে ঘিরে স্বজনেরা সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ছেলে, পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারিয়ে তিনি শোকে ভেঙে পড়েছেন।

ছেলের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের স্মৃতি মনে করে মতিয়ার রহমান বলেন, “আগুনে পোড়ার আগের রাতে নাহিদের সঙ্গে শেষ কথা হয়। তখন সে আমাকে বলে, ‘বাবা, তুমি চিন্তা করো না। তোমার নাতিরা সি বিচে আছে। বাচ্চারা খেলছে। মঙ্গলবার ঢাকায় ফিরব। বুধবার তুমি ঢাকার মিরপুরের বাসায় চলে যেও।’ ওই শেষ কথা। আর কথা হবে না আর।”

বিজ্ঞাপন

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “ছুটিতে গ্রামে আসলে নাতিরা মাতিয়ে রাখতে বাড়ি। কত খেলা করতাম। আর কিছু হবে না। ফুলের মতো মাসুম বাচ্চারাও পুড়ে মারা গেছে। কত কষ্ট পেয়েছে আমার সোনার মানিকরা।”

রিসোর্টের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

নাহিদুরের ফুপা আব্দুল লতিফ বলেন, “সাধারণত যারা কর্মজীবী মানুষ তারা একটু সময় পেলেই বিনোদনের জন্য রিসোর্টে যায়। কিন্তু সেই রিসোর্টগুলো যদি অনিয়ন্ত্রিত হয় কিংবা অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেখানে সবসময়ই জীবনের ঝুঁকি থাকে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে এইরকম তাজা প্রাণগুলো যে অকালেই ঝরে গেল, এর দায়ভার কে নেবে?”

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, “আমাদের তো একটা পরিবার শেষ হয়ে গেল। এখন তো আর ফিরে পাব না। তবে এসব অব্যবস্থাপনা সংস্কার ও জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।”

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

‘একসঙ্গে চারটি কবর খুঁড়তে আগে দেখিনি’

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জানাজা শেষে বুধবার বিকেল ৪টার দিকে পারিবারিক কবরস্থানে চারজনকে দাফন করা হয়। সকাল থেকেই সেখানে কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করেন গোরখোদক। নাহিদুরের মায়ের কবরের পাশেই পাশাপাশি সমাহিত করা হয় নাহিদুর, তাঁর স্ত্রী ও দুই মেয়েকে।

বিজ্ঞাপন

কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মোহনপুরের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা রবিউল ইসলাম (৬০)। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি বলেন, “এতদিন শুধু শুনেছি একসঙ্গে একাধিক মানুষকে কবর দেওয়া হয়েছে। এবার চোখের সামনে দেখছি। পাশাপাশি চারটি কবর খোঁড়া হয়েছে। একই পরিবারের চারজনকে কবর দেওয়ার এমন দৃশ্য আমাদের গ্রামে দেখিনি।”

ডিএনএ পরীক্ষার পর মরদেহ হস্তান্তর

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, নাহিদুর ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরিবার নিয়ে তিনি রাজধানীর মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় বসবাস করতেন।

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হওয়ার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। মঙ্গলবার তাঁদের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে মরদেহগুলো হস্তান্তর করেন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমান এবং সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালামসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD