ছাত্রদল-শিবির সংঘাতে উত্তপ্ত ক্যাম্পাস, বাড়ছে উদ্বেগ

দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধিপত্য বিস্তার, আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। টানা তিন দিনে অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটেছে। এতে শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগও বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ঘিরে উভয় সংগঠনই একে অপরের বিরুদ্ধে হামলা, উসকানি ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলেছে। একই সঙ্গে শিক্ষাবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে দেশের অন্যান্য ক্যাম্পাসেও এ ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ছাত্রশিবিরের নেতাদের দাবি, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই বিভিন্ন ক্যাম্পাসে তাদের নেতাকর্মীদের লক্ষ্য করে চাপ সৃষ্টি ও সংঘাতের চেষ্টা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন সংযম দেখানো হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা আর নীরব থাকতে চান না বলে সংগঠনটির নেতারা মন্তব্য করেছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য, বিএনপি সরকারে থাকলেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকেও তারা বাড়তি গুরুত্ব পাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধৈর্য ধরে থাকা সম্ভব নয় বলেও তাদের দাবি।
বিজ্ঞাপন
গত ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলকে কেন্দ্র করে দুই সংগঠনের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের উত্তেজনা দেখা দেয়। একটি কক্ষকে ঘিরে বিরোধের জেরে উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে হাতাহাতি ও সংঘর্ষ হয়। পরে দুই পক্ষই পৃথক বিক্ষোভ মিছিল বের করলে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
এর পরদিন রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানবিষয়ক একটি প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত কয়েকটি ছবি নিয়ে আপত্তি জানায় ছাত্রদল। পরে বিষয়টি সংঘর্ষে রূপ নেয়। সংঘর্ষ শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, ভিডিও ও পোস্ট আরও উত্তেজনা বাড়িয়ে তোলে।
মঙ্গলবার রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রবেশকে কেন্দ্র করে নতুন করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় ছাত্রদল, জকসু এবং ছাত্রশিবির-সমর্থিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি, মারধর ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
সংঘর্ষে জকসুর কয়েকজন নির্বাচিত প্রতিনিধি আহত হন। পরে আহতদের চিকিৎসার জন্য ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, হাসপাতাল এলাকায় আবারও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার মধ্যেই ঢাকা কলেজেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থান উপলক্ষে আয়োজিত একটি কর্মসূচির প্রস্তুতিকালে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালানো হয়। এতে সংগঠনটির এক নেতা গুরুতর আহত হন।
পরে বিকেলে রাজধানীর সায়েন্সল্যাব মোড় এলাকায় দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে উভয় পক্ষের কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
বিজ্ঞাপন
একই দিনে পুরান ঢাকার সরকারি আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসেও ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসের চলমান ঘটনাকে কেন্দ্র করে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে দুই পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব অভিযোগ করেন, বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবির পরিকল্পিতভাবে ছাত্রদলের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে এবং সংঘাতের পরিবেশ তৈরি করছে। তার ভাষ্য, একের পর এক হামলার ঘটনায় আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন তাদের নেতাকর্মীরা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেন, সাম্প্রতিক প্রতিটি ঘটনাতেই ছাত্রদলের পক্ষ থেকেই আগে হামলা হয়েছে। তার অভিযোগ, ক্যাম্পাসে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, হল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যেই এসব কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ক্রমাগত সংঘর্ষের ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন, অতীতে ক্যাম্পাসে যে ধরনের সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি সেদিকেই আবার এগোচ্ছে। নিরাপদ শিক্ষাঙ্গনের প্রত্যাশা থেকে সরে গিয়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় তারা হতাশা প্রকাশ করেছেন।
দিনজুড়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সংঘর্ষের ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের সহিংসতা বা সন্ত্রাস বরদাশত করা হবে না। যেসব শিক্ষার্থী বা সংগঠন শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরীর মতে, দুই ছাত্রসংগঠনের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা ক্রমেই সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে পেশীশক্তির পরিবর্তে গণতান্ত্রিক চর্চা প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। অন্যথায় শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক একাডেমিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।








