ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসির নির্দেশে চাকরি হারালেন ২৬৮ কর্মচারী

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। দীর্ঘ ১০ থেকে ২০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগে কাজ করার পর হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তারা। চাকরি হারানোর পাশাপাশি টানা তিন মাসের বেতন বকেয়া থাকায় চরম আর্থিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে এসব কর্মচারীর।
বিজ্ঞাপন
থোক বরাদ্দ, দৈনিক মজুরি ও পোষ্য কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া এসব কর্মচারীর চাকরি স্থায়ী না করেই তাদের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। চাকরিচ্যুত কর্মচারীদের আশঙ্কা, তাদের পদগুলোতে নতুন করে লোক নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দাবি, নিজস্ব সিদ্ধান্তে নয়, ইউজিসির নির্দেশনা এবং সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের বেতন বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি বকেয়া বেতন পরিশোধের আশ্বাসও দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিভিন্ন দপ্তর ও বিভাগের প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী ভিত্তিতে কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। তাদের মধ্যে কেউ থোক বরাদ্দের আওতায়, কেউ দৈনিক মজুরিতে এবং কেউ পোষ্য কোটায় নিয়োগ পান।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকনিক্যাল ও নন-টেকনিক্যাল মিলিয়ে মোট ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারী কর্মরত ছিলেন। তাদের মধ্যে ৬২ জন বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী থোক বরাদ্দের ভিত্তিতে নিয়োগ পান। এদের অধিকাংশই পোষ্য কোটার আওতায় কর্মরত। বাকি প্রায় ২০০ জন দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে বিভিন্ন দপ্তরে দায়িত্ব পালন করতেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
এসব কর্মচারীর বেতন-ভাতা বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হতো। ইউজিসির বিশেষ বরাদ্দ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন তহবিল থেকে তাদের বেতন পরিশোধ করা হতো। তবে অর্থসংকটের কারণে একপর্যায়ে নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি ঋণ নিয়েও বেতন পরিশোধ করতে হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।
বিজ্ঞাপন
কর্মচারীদের বেতন কয়েক দফায় বাড়ানো হলেও চাকরি স্থায়ীকরণের দাবি দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়েছে। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সিন্ডিকেটের অনুমোদনে নন-টেকনিক্যাল কর্মচারীদের মাসিক বেতন ১০ হাজার এবং টেকনিক্যাল কর্মচারীদের ১১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়।
স্থায়ীকরণের দাবিতে আন্দোলন, হাইকোর্টে রিট
চাকরি স্থায়ী করা ও বেতন বাড়ানোর দাবিতে বিভিন্ন সময়ে উপাচার্যের কার্যালয় ঘেরাও, অবস্থান কর্মসূচি এবং মানববন্ধন করেছেন অস্থায়ী কর্মচারীরা। তাদের মধ্যে ৫৬ জন চাকরি স্থায়ীকরণের দাবিতে হাইকোর্টে রিট পিটিশনও দায়ের করেছেন।
বিজ্ঞাপন
কর্মচারীদের অভিযোগ, পোষ্য কোটায় নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের স্থায়ীভাবে নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও দীর্ঘদিনেও তাদের চাকরি স্থায়ী করা হয়নি।
তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের ১৯৬তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনো কর্মচারী কর্মরত অবস্থায় মারা গেলে তার স্ত্রী বা সন্তানদের যোগ্যতা অনুযায়ী জরুরি ভিত্তিতে স্থায়ী নিয়োগ দেওয়ার বিধান রয়েছে। অতীতে ১৯৯৬ সালের দিকে একই প্রক্রিয়ায় পোষ্য কোটায় দুজনকে স্থায়ী নিয়োগও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে কর্মরত কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সেই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ তাদের।
কর্মচারীরা বলছেন, সীমিত বেতনে দীর্ঘদিন ধরে পরিবার চালাতে এমনিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে চাকরি হারিয়ে তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের কর্মঅভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নতুন করে চাকরি পাওয়ার সুযোগও সীমিত বলে মনে করছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
ইউজিসির নির্দেশনা ঘিরে তৈরি হয়েছে জটিলতা
২০২০ সালে ইউজিসির প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতন বরাদ্দের বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছিল, অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছর পর্যন্ত এডহক, মাস্টাররোল ও দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরত কর্মচারীদের বেতন বরাদ্দ অব্যাহত থাকবে। তবে ২০১৯-২০২০ অর্থবছর থেকে কমিশনের পূর্বানুমোদন ছাড়া নতুন করে নিয়োগ পাওয়া কর্মচারীদের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ রাখা হবে না।
কর্মচারীদের দাবি, ইউজিসির এ ধরনের নির্দেশনা আগে থেকেই থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের প্রশাসনগুলো তাদের বেতন বন্ধ করেনি। বরং দীর্ঘদিন ধরে তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২৬৮ জন অস্থায়ী কর্মচারীর জন্য নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না দেওয়া এবং তাদের আর না রাখার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছে ইউজিসি। কমিশনের পাঠানো চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সর্বশেষ সিন্ডিকেট সভায় এসব কর্মচারীর বেতন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনবল সংকটের বিষয়ে নতুন করে নোট পাঠানোর নির্দেশনাও দিয়েছে ইউজিসি। প্রশাসন সে অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও দপ্তর চাইলে এসব কর্মচারীকে কাজে রাখতে পারবে। সে ক্ষেত্রে তাদের বেতনের সম্পূর্ণ দায়ভার সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা দপ্তরকে বহন করতে হবে।
চাকরি হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় কর্মচারীরা
বিজ্ঞাপন
চাকরি হারানোর ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন কর্মচারী ইমতিয়াজ আহমেদ অন্তু। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরিচ্যুত হওয়ায় তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অন্য কোথাও চাকরি করার মতো পরিস্থিতিও সবার নেই।
পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘পরিবার নিয়ে এখন কীভাবে চলবো, কোথায় যাব কিংবা কী পরিচয়ে মানুষের সামনে দাঁড়াবো। পরিবার নিয়ে এখন আত্মহত্যা ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় নেই।’
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন নীতিমালা অনুসরণ করে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই পোষ্য কোটায় তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চাকরি স্থায়ী করার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু এখন সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করেই তাদের বাদ দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
ইমতিয়াজ আহমেদ অন্তু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ থেকে ২০ বছর দায়িত্ব পালনের পর এভাবে চাকরি থেকে বাদ দেওয়া অমানবিক। তাদের জায়গায় নতুন লোক নিয়োগ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন তারা। নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে লোক নেওয়া হলে সেখানে আর্থিক লেনদেনের আশঙ্কাও রয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য, ইউজিসির নির্দেশনাকে চাকরিচ্যুতির কারণ হিসেবে দেখানো হলেও প্রতিবছরই এ ধরনের চিঠি এসেছে। কিন্তু আগের প্রশাসনগুলো তাদের চাকরি থেকে বাদ দেয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থসংকটের কথা জানালেন উপাচার্য
এ বিষয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, ইউজিসি এ খাতে কোনো অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকেই কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করতে হচ্ছে। আর্থিক সংকটের কারণে বেতন বকেয়া তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, কর্মচারীদের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নিজ উদ্যোগে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। ইউজিসির নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপাচার্য বলেন, এসব কর্মচারীর বেতন দিতে প্রতি মাসে প্রায় ২১ লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু এই অর্থের সংস্থান কীভাবে করা হবে, তা নিয়ে জটিলতা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব তহবিল থেকে নিয়মিত এত বড় অঙ্কের ব্যয় বহন করাও কঠিন।
দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করা ২৬৮ কর্মচারীর চাকরি হারানোর ঘটনায় একদিকে মানবিক ও কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতা ও নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এখন কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধ এবং তাদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।








