Logo

অকার্যকর তালাক দেখিয়ে ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না: হাইকোর্ট

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৬ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫৫
অকার্যকর তালাক দেখিয়ে ভরণপোষণ এড়ানো যাবে না: হাইকোর্ট
ছবি: সংগৃহীত

আইন অনুযায়ী প্রমাণিত বা কার্যকর নয় এমন তালাকের অজুহাত দেখিয়ে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কিংবা দেনমোহরের অর্থ পরিশোধ এড়ানো যাবে না বলে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আদালত স্পষ্ট করেছেন, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ কোনোভাবেই মা-বাবার তালাকসংক্রান্ত বিরোধের ওপর নির্ভরশীল নয়; এটি শিশুর নিজস্ব ও স্বাধীন আইনগত অধিকার।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি বিচারপতি আবদুর রহমানের একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রায়ের অনুলিপি প্রকাশ্যে আসে।

মামলার পটভূমি

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০১১ সালে এক দম্পতির বিয়ে হয়। পরবর্তীতে স্ত্রী ও তাদের নাবালক কন্যার পক্ষে দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবিতে পারিবারিক আদালতে মামলা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

মামলায় স্বামী দাবি করেন, তিনি আগেই স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেন। তবে ফ্যামিলি কোর্টে তিনি আইনসম্মতভাবে সেই তালাক কার্যকর হয়েছে—এমন প্রমাণ দিতে ব্যর্থ হন। এরপর আদালত স্ত্রী ও সন্তানের পক্ষে দেনমোহর এবং ভরণপোষণের ডিক্রি দেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরে স্বামী নতুন করে একটি ঘোষণামূলক মামলা দায়ের করে তালাক কার্যকর হয়েছে বলে দাবি করেন এবং সেই মামলার অজুহাতে ভরণপোষণ ও দেনমোহরের ডিক্রির বাস্তবায়ন স্থগিতের আবেদন জানান। নিম্ন আদালত আবেদনটি খারিজ করলে তিনি হাইকোর্টে যান।

ডিক্রি বাস্তবায়নে বাধা দেওয়া যাবে না

বিজ্ঞাপন

রায়ে হাইকোর্ট বলেন, কেবল নতুন একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে—এ কারণে পূর্বে দেওয়া চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বন্ধ করা যাবে না। কোনো উপযুক্ত আদালত ডিক্রি স্থগিত না করা পর্যন্ত সেটি কার্যকর থাকবে এবং এক্সিকিউশন আদালত তা বাস্তবায়নে বাধ্য।

আদালত আরও পর্যবেক্ষণ করেন, আইন অনুযায়ী প্রমাণিত নয় বা কার্যকর হয়নি—এমন তালাকের কোনো আইনগত মূল্য নেই। ফলে এমন তালাকের দাবি বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটায় না এবং দেনমোহর বা ভরণপোষণ আদায়ের ক্ষেত্রেও কোনো বাধা সৃষ্টি করতে পারে না।

পারিবারিক বিরোধে ফ্যামিলি কোর্টের একচ্ছত্র এখতিয়ার

বিজ্ঞাপন

রায়ে হাইকোর্ট পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, বিয়ে, তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ এবং বৈবাহিক অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র এখতিয়ার ফ্যামিলি কোর্টের। অন্য কোনো আদালত এসব বিষয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত দিতে পারে না, যদি না আইন তা অনুমোদন করে।

নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ স্বতন্ত্র অধিকার

রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাবালক সন্তানের অধিকার নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ।

বিজ্ঞাপন

হাইকোর্ট বলেন, একজন নাবালক সন্তানের ভরণপোষণের অধিকার সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র আইনগত অধিকার। মা-বাবার মধ্যে তালাক নিয়ে বিরোধ থাকলেও সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। কোনো পিতা তালাকসংক্রান্ত বিরোধকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সন্তানের ভরণপোষণের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারেন না।

এক্সিকিউশন আদালতের সীমিত ভূমিকা

আদালত আরও বলেন, এক্সিকিউশন আদালতের দায়িত্ব কেবল বিদ্যমান ডিক্রি বাস্তবায়ন করা। তালাক বৈধ হয়েছে কি না, বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল আছে কি না—এসব বিষয়ে নতুন করে বিচার করার এখতিয়ার তাদের নেই। ডিক্রির বাইরে গিয়ে নতুন বিরোধ নিষ্পত্তি করাও তাদের ক্ষমতার মধ্যে পড়ে না।

বিজ্ঞাপন

নতুন তালাকের সুযোগ থাকলেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, যদি আগে দাবি করা তালাক আইনগতভাবে অকার্যকর প্রমাণিত হয় এবং স্বামী সত্যিই বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটাতে চান, তাহলে তিনি আইন মেনে নতুন করে তালাক দেওয়ার সুযোগ পাবেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে আদালত স্পষ্ট করেন, ভবিষ্যতে নতুন তালাক দেওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়ে পূর্বে দেওয়া দেনমোহর ও ভরণপোষণের ডিক্রির দায় থেকে কোনোভাবেই মুক্তি পাওয়া যাবে না।

বিজ্ঞাপন

নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল

হাইকোর্ট মামলার রুল খারিজ করে নিম্ন আদালতের আদেশ বহাল রাখেন। একই সঙ্গে স্বামীকে স্ত্রী ও নাবালক সন্তানের সব বকেয়া ভরণপোষণ এবং দেনমোহরের বকেয়া অর্থ পরিশোধের নির্দেশ দেন।

রায়ের গুরুত্ব

বিজ্ঞাপন

আইনজীবীদের মতে, এ রায় পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এতে তিনটি মৌলিক নীতি আরও স্পষ্ট হয়েছে—আইনসম্মতভাবে প্রমাণিত না হলে তালাক কার্যকর বলে গণ্য হবে না, নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ তার নিজস্ব আইনগত অধিকার এবং নতুন মামলা দায়ের করে আদালতের চূড়ান্ত ডিক্রির বাস্তবায়ন বিলম্বিত করা যাবে না।

মামলায় স্বামীর পক্ষে শুনানি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. শহিদুল ইসলাম। অপরদিকে স্ত্রীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান ও ইফাত হাসান শাম্মি।

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, এই সিদ্ধান্ত পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে হাইকোর্ট স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, অপ্রমাণিত তালাকের অজুহাতে স্ত্রী বা নাবালক সন্তানের ভরণপোষণ বন্ধ করা যাবে না। একই সঙ্গে নারী ও শিশুর আইনগত অধিকার সুরক্ষা এবং আদালতের চূড়ান্ত আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও এ রায় ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD