তাহসিফ হত্যার ৮ দিনেও মেলেনি শেষ রাতের একাধিক প্রশ্নের উত্তর

‘রওয়ানা দিছি, আইতেছি’—মাকে এমন বার্তা পাঠিয়েও আর বাড়ি ফেরা হয়নি বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির। পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। ঘটনার আট দিন পেরিয়ে গেলেও মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং শেষ রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি তদন্তসংশ্লিষ্টরা। হত্যা মামলায় গ্রেফতার দুই আসামিকে কয়েক দফা রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে তাদের বক্তব্য, সিসিটিভি ফুটেজ ও ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
বিজ্ঞাপন
তদন্তে এখন পর্যন্ত তাহসিফের শেষ কয়েক ঘণ্টার চলাফেরা, তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের ভূমিকা এবং পরিচিত এক তরুণীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। কিন্তু নদের তীরের মাঠে কী ঘটেছিল, তাহসিফ কীভাবে পানিতে পড়লেন এবং অন্য কেউ এ ঘটনায় জড়িত কি না—এসব বিষয় এখনো রহস্যের মধ্যে রয়েছে।
তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যায় বন্ধু দীপ বাসায় এলে মাকে বলে বেরিয়ে যান তাহসিফ। যাওয়ার সময় তিনি বলেন, ‘দীপ আসছে, কথা বলে আসি।’ রাত বাড়লেও ছেলে ফিরে না আসায় মা একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। পরে রাত ১টা ৩৬ মিনিটে তাহসিফের ফোন থেকে মায়ের মেসেঞ্জারে একটি ভয়েস বার্তা আসে। সেখানে তিনি বলেন, ‘রওয়ানা দিছি আইতেছি’। কিন্তু এরপর আর তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
ঘটনার পর তাহসিফের কয়েকটি সিসিটিভি ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ে। সেসব ফুটেজে দেখা যায়, ঘটনার রাতে দীপ ও তাহসিফের সঙ্গে পরিচিত এক তরুণীও ছিলেন। রাতভর বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি এবং রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়ার পর একপর্যায়ে তাহসিফ ও দীপ টঙ্গীর মাজার বস্তি হয়ে তুরাগ নদের তীরবর্তী একটি মাঠের দিকে যান।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
গ্রেফতারের পর পুলিশের কাছে দীপ দাবি করেন, ওই এলাকায় যাওয়ার পর দুজন আলাদা হয়ে যান। তবে এরপর কী ঘটেছিল, তাহসিফ কীভাবে নদে পড়লেন কিংবা তার মৃত্যুর পেছনে অন্য কারও ভূমিকা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবিতে ৩০ অক্টোবর লিখিত আবেদন করেন তার বাবা। পরদিন ৩১ অক্টোবর উত্তরখান থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন তিনি। দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়। এসব ধারায় যথাক্রমে হত্যা, অপরাধের আলামত গোপন বা নষ্ট করা এবং অভিন্ন উদ্দেশ্যে একাধিক ব্যক্তির অপরাধের দায়ের বিধান রয়েছে।
ছেলের মৃত্যু নিয়ে শুরু থেকেই সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন তাহসিফের বাবা। তিনি বলেন, আত্মহত্যার প্রশ্ন আসে না, তাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। তবে কারা এবং কী কারণে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, তা তিনি জানেন না। তাহসিফ মাঝেমধ্যে কিছু আশঙ্কার কথা বলতেন বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ওই আশঙ্কার সঙ্গে মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, তা তদন্তে যাচাই করার দাবি জানিয়েছে পরিবার।
বিজ্ঞাপন
শেষ কয়েক ঘণ্টার চলাফেরা
পুলিশের রিমান্ডে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর সন্ধ্যা ৬টার দিকে দীপ তাহসিফকে বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যান। প্রথমে তারা একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে যান। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন পরিচিত ওই তরুণী। এরপর তিনজন উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরের সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসে যান। সেখান থেকে তারা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টেও যান। সেখানে খাবার ও পানীয় গ্রহণের পর তরুণী বাসায় ফিরে যান।
এরপর তাহসিফ ও দীপের গতিবিধি নিয়ে তদন্তে একাধিক প্রশ্ন তৈরি হয়। দীপের বক্তব্য অনুযায়ী, ২৮ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১২টা ৪০ মিনিটে তারা টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় পৌঁছান। সেখান থেকে তুরাগ নদের তীরের একটি মাঠের দিকে যাওয়ার সময় কয়েকজন লোককে দেখে তারা আলাদা হয়ে যান।
বিজ্ঞাপন
তবে ওই ব্যক্তিরা কারা ছিলেন, তাদের দেখে কেন দুজন আলাদা হলেন এবং এরপর তাহসিফের সঙ্গে কী ঘটেছিল—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। পুলিশের প্রথম রিমান্ড আবেদনে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত স্থান নির্ধারণ, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের শনাক্ত এবং তাহসিফের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল উদ্ধারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
দীপের বক্তব্যে অসঙ্গতি, খোঁজ ১৫-২০ মিনিটের
তদন্তের শুরুতে দীপ দাবি করেছিলেন, কয়েকজন লোকের ধাওয়ার মুখে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। এরপর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে যান। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তার বক্তব্যে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল বলে জানিয়েছিল পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। নদের তীর থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধারের তথ্যও সামনে আসে। সেটি তাহসিফের কি না, তা যাচাইয়ের কথা জানায় তদন্তসংশ্লিষ্ট সংস্থা।
বিজ্ঞাপন
পরে মামলার তদন্তভার টঙ্গী নৌপুলিশের কাছে গেলে দীপকে গ্রেফতার করা হয়। ৩১ অক্টোবর প্রথম দফা রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন জানান, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন দীপ তাহসিফকে ডেকে মাজার বস্তি এলাকায় নিয়ে যান। প্রাথমিক তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে দীপের সংশ্লিষ্টতার তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে বলেও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দ্বিতীয় দফা রিমান্ড আবেদনে নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে দীপের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের অনুপস্থিতির বিষয়টি সামনে আনে পুলিশ। ওই সময় তিনি কোথায় ছিলেন, কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কী কথা হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
৩ নভেম্বর রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন আদালতে বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই সময়ের অবস্থান ও যোগাযোগের তথ্য ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এ জন্য সিসিটিভি ফুটেজ, মুঠোফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) এবং দীপের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের আবেদনে বলা হয়, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ ঘটনার দিন তাহসিফের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার বিষয়ে তথ্য দিলেও হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর জবাব এড়িয়ে গেছেন। কিছু তথ্য পাওয়া গেলেও তদন্তের স্বার্থে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। পরবর্তী রিমান্ড আবেদনে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, সহযোগী কিংবা ভাড়াটে খুনি জড়িত ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের কথাও জানানো হয়।
তরুণীর ভূমিকা নিয়েও চলছে অনুসন্ধান
তদন্তের দ্বিতীয় অভিযুক্ত হিসেবে সামনে আসে তাহসিফের পরিচিত এক তরুণীর নাম। পুলিশের আবেদনে বলা হয়, সিসিটিভি ফুটেজ ও ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনায় ঘটনার দিন তাহসিফ ও দীপের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ওই তরুণীর উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। মোটরসাইকেল গ্যারেজ, সিপি ফাইভ স্টার এবং নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাদের একসঙ্গে থাকার বিষয়টি তদন্তে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
১ নভেম্বর রাত আনুমানিক ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুলের বাসা থেকে ওই তরুণীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে আদালত তার প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দ্বিতীয় দফা রিমান্ড আবেদনে পুলিশ জানতে চায়, ঘটনার দিন সিপি ফাইভ স্টার কিংবা নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে তাহসিফের সঙ্গে ওই তরুণীর কোনো বিরোধ বা কথা কাটাকাটি হয়েছিল কি না। তাদের মধ্যে আগে থেকে কোনো সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখতে চায় তদন্ত দল। দীপ ও ওই তরুণীর বক্তব্যের মধ্যে মিল-অমিল যাচাইয়ের কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে ওই তরুণী বিভিন্ন স্থানে যাওয়া এবং তাহসিফের সঙ্গে অবস্থানের বিষয়ে তথ্য দিলেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গেছেন। তবে তদন্তের স্বার্থে তার বক্তব্যের বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, ওই তরুণীর আইনজীবী শাহারিয়ার রহমান আদালতে দাবি করেন, তাহসিফ নিজেই তার মক্কেলকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে বিরোধ থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয় বলে যুক্তি দেন তিনি।
রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
রিমান্ড শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, ঘটনার আগে তাহসিফকে সর্বশেষ দীপ ও ওই তরুণীর সঙ্গে দেখা গেছে। বিভিন্ন স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ, কললিস্ট এবং জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে তাদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। দীপের ১৫ থেকে ২০ মিনিটের অনুপস্থিতি এবং দুই অভিযুক্তের বক্তব্যের অসংগতিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন
•
•
•
•
•
অন্যদিকে, দীপের আইনজীবী মনিরুল ইসলাম আদালতে বলেন, তাহসিফের সঙ্গে তার মক্কেলের প্রায় সাত বছরের সম্পর্ক ছিল। তার মক্কেল তদন্তে সহযোগিতা করেছেন। তাহসিফ কেন রাত ২টার দিকে মাদকপ্রবণ এলাকায় গিয়েছিলেন, সেটিও তদন্তের বিষয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। ঘটনাটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে তার মক্কেল যেন গণমাধ্যমের বিচারের শিকার না হন, সে আহ্বান জানান।
পরবর্তী শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী দাবি করেন, আগের রিমান্ডে তার মক্কেল প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়েছেন। নতুন করে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। পাশাপাশি রিমান্ডে স্বাস্থ্য ও খাবারের সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়টি আদালতের নজরে এনে জামিন চান।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌপুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন জানান, ঘটনার আগে ও পরে তাহসিফের সঙ্গে কারা যোগাযোগ করেছিলেন, আসামিদের অবস্থান কোথায় ছিল এবং অন্য কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ফোনের কল ডিটেইলস রেকর্ড এবং আসামিদের দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করা হচ্ছে। হত্যার উদ্দেশ্য ও ঘটনার পেছনে কোনো পরিকল্পনা ছিল কি না, তা নিশ্চিত হতে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, ঘটনার সুনির্দিষ্ট স্থান এবং শেষ মুহূর্তে তার সঙ্গে কী ঘটেছিল—কোনো প্রশ্নেরই এখনো চূড়ান্ত উত্তর মেলেনি। নদের তীরের মাঠে দীপের বর্ণনায় থাকা ব্যক্তিরা কারা, মোটরসাইকেলটির অবস্থান কোথায় এবং দুই অভিযুক্তের বক্তব্যের সঙ্গে সিসিটিভি ও কললিস্টের তথ্য কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, সেসব বিষয়ও তদন্তাধীন। এসব সূত্রের সমন্বিত বিশ্লেষণেই হয়তো উন্মোচিত হবে তাহসিফের শেষ রাতের প্রকৃত ঘটনা।








